সংসারের প্রতি অনাসক্তি ও অন্তরের কোমলতা

১৮৬৫. আনাস ইবনি মালিক [রাদি.] থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ্ [সাঃআঃ] বলেছেনঃ তিনটি জিনিস মৃত ব্যক্তির অনুসরণ করে থাকে। দুটি ফিরে আসে, আর একটি তার সঙ্গে থেকে যায়। তার পরিবারবর্গ, তার মাল ও তার আমাল তার অনুসরণ করে থাকে। তার পরিবারবর্গ ও তার মাল ফিরে আসে, পক্ষান্তরে তার আমাল তার সঙ্গে থেকে যায়।

[বুখারী পর্ব ৮১ অধ্যায় ৪২ হাদীস নং ৬৫১৪; মুসলিম পর্ব ৫৩/হাঃ ২৯৬০]. সংসারের প্রতি অনাসক্তি – এই হাদীসটির তাহক্কিকঃ সহীহ হাদীস


১৮৬৬. মিস্ওয়ার ইবনি মাখরামাহ [রাদি.] থেকে বর্ণিতঃ

আম্‌র ইবনি আউফ আনসারী [রাদি.] যিনি বনী আমির ইবনি লুয়াইয়ের মিত্র ছিলেন এবং বদর যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, তিনি তাঁকে বলেছেন যে, আল্লাহর রসূল [সাঃআঃ] আবু উবাইদাহ ইবনি জাররাহ [রাদি.]-কে বাহরাইনের জিযিয়া আদায় করার জন্য পাঠালেন। আর রসূলূল্লাহ্ [সাঃআঃ] বাহরাইনবাসীদের সঙ্গে সন্ধি করেছিলেন এবং আলা ইবনি হাযরামী [রাদি.]-কে তাদের আমীর নিযুক্ত করেছিলেন। আবু উবাইদাহ [রাদি.] বাহরাইন হতে অর্থ সম্পদ নিয়ে এলেন। আনসারগণ আবু উবাইদাহর আগমন বার্তা শুনে আল্লাহর রসূল [সাঃআঃ]-এর সঙ্গে ফজরের সলাতে সবাই হাযির হন। যখন আল্লাহর রসূল [সাঃআঃ] তাঁদের নিয়ে ফজরের সলাত আদায় করে ফিরলেন, তখন তারা তাঁর সামনে হাযির হলেন। আল্লাহর রসূল [সাঃআঃ] তাদের দেখে মুচকি হাসলেন এবং বললেন, আমার মনে হয় তোমরা শুনেছ, আবু উবাইদাহ [রাদি.] কিছু নিয়ে এসেছেন। তারা বললেন, হ্যাঁ, হে আল্লাহর রসূল [সাঃআঃ]। আল্লাহর রসূল [সাঃআঃ] বললেন, সুসংবাদ গ্রহণ কর এবং যা তোমাদের খুশী করে তার আকাঙ্ক্ষা রাখ। আল্লাহ্‌র কসম! আমি তোমাদের ব্যাপারে দারিদ্র্যের ভয় করি না। কিন্তু তোমাদের ব্যাপারে এ আশঙ্কা করি যে, তোমাদের উপর দুনিয়া এরূপ প্রসারিত হয়ে পড়বে যেমন তোমাদের অগ্রবর্তীদের উপর প্রসারিত হয়েছিল। আর তোমরাও দুনিয়ার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়বে, যেমন তারা আকৃষ্ট হয়েছিল। আর তা তোমাদের বিনাশ করবে, যেমন তাদের বিনাশ করেছে।

[বুখারী পর্ব ৫৮ অধ্যায় ১ হাদীস নং ৩১৫৮; মুসলিম ৫৩ হাঃ ২৯৬১]; সংসারের প্রতি অনাসক্তি – এই হাদীসটির তাহক্কিকঃ সহীহ হাদীস


১৮৬৭. আবু হুরাইরাহ [রাদি.] থেকে বর্ণিতঃ

রসূলুল্লাহ্ [সাঃআঃ] বলেছেনঃ তোমাদের কারো দৃষ্টি যদি এমন ব্যক্তির উপর নিপতিত হয়, যাকে সম্পদে ও দৈহিক গঠনে অধিক মর্যাদা দেয়া হয়েছে তবে সে যেন এমন ব্যক্তির দিকে তাকায়, যে তার চেয়ে হীন অবস্থায় রয়েছে।

[বুখারী পর্ব ৮১ অধ্যায় ৩০ হাদীস নং ৬৪৯০; মুসলিম]; সংসারের প্রতি অনাসক্তি – এই হাদীসটির তাহক্কিকঃ সহীহ হাদীস


১৮৬৮. আবু হুরাইরাহ্ [রাদি.] থেকে বর্ণিতঃ

তিনি আল্লাহর রসূল [সাঃআঃ]-কে বলতে শুনেছেন, বনী ইসরাইলের মধ্যে তিনজন লোক ছিল। একজন শ্বেতরোগী, একজন মাথায় টাকওয়ালা আর একজন অন্ধ। মহান আল্লাহ তাদেরকে পরীক্ষা করতে চাইলেন। কাজেই, তিনি তাদের নিকট একজন ফেরেশতা পাঠালেন। ফেরেশতা প্রথমে শ্বেত রোগীটির নিকট আসলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নিকট কোন জিনিস অধিক প্রিয়? সে জবাব দিল, সুন্দর রং ও সুন্দর চামড়া। কেননা, মানুষ আমাকে ঘৃণা করে। ফেরেশতা তার শরীরের উপর হাত বুলিয়ে দিলেন। ফলে তার রোগ সেরে গেল। তাকে সুন্দর রং এবং সুন্দর চামড়া দান করা হল। অতঃপর ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ ধরনের সম্পদ তোমার নিকট অধিক প্রিয়? সে জবাব দিল উট অথবা সে বলল, গরু। এ ব্যাপারে বর্ণনাকারীর সন্দেহ রয়েছে যে শ্বতরোগী না টাকওয়ালা দুজনের একজন বলেছিল উট আর অপরজন বলেছিল গরু। অতএব তাকে একটি দশ মাসের গর্ভবতী উটনী দেয়া হল। তখন ফেরেশ্তা বললেন, “এতে তোমার জন্য বরকত হোক।”

[বর্ণনাকারী বলেন] ফেরেশতা টাকওয়ালার নিকট গেলেন এবং বললেন, তোমার নিকট কী জিনিস পছন্দনীয়? সে বলল, সুন্দর চুল এবং আমার হতে যেন এ রোগ চলে যায়। মানুষ আমাকে ঘৃণা করে। বর্ণনাকারী বলেন, ফেরেশতা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং তৎক্ষণাৎ মাথার টাক চলে গেল। তাকে সুন্দর চুল দেয়া হল। ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ সম্পদ তোমার নিকট অধিক প্রিয়? সে জবাব দিল, গরু। অতঃপর তাকে একটি গর্ভবতী গাভী দান করলেন। এবং ফেরেশতা দুআ করলেন, এতে তোমাকে বরকত দান করা হোক।

অতঃপর ফেরেশতা অন্ধের নিকট আসলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ জিনিস তোমার নিকট অধিক প্রিয়? সে বলল, আল্লাহ্ যেন আমার চোখের জ্যোতি ফিরিয়ে দেন, যাতে আমি মানুষকে দেখতে পারি। নাবী [সাঃআঃ] বললেন, তখন ফেরেশতা তার চোখের উপর হাত বুলিয়ে দিলেন, তৎক্ষণাৎ আল্লাহ্ তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলেন। ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ সম্পদ তোমার নিকট অধিক প্রিয়? সে জবাব দিল ছাগল। তখন তিনি তাকে একটি গর্ভবতী ছাগী দিলেন। উপরে উল্লেখিত লোকদের পশুগুলো বাচ্চা দিল। ফলে একজনের উটে ময়দান ভরে গেল, অপরজনের গরুতে মাঠ পূর্ণ হয়ে গেল এবং আর একজনের ছাগলে উপত্যকা ভরে গেল।

অতঃপর ঐ ফেরেশতা তাঁর পূর্ববর্তী আকৃতি প্রকৃতি ধারণ করে শ্বেতরোগীর নিকট এসে বললেন, আমি একজন নিঃস্ব ব্যক্তি। আমার সফরের সম্বল শেষ হয়ে গেছে। আজ আমার গন্তব্য স্থানে পৌঁছার আল্লাহ্ ব্যতীত কোন উপায় নেই। আমি তোমার নিকট ঐ সত্তার নামে একটি উট চাচ্ছি, যিনি তোমাকে সুন্দর রং কোমল চামড়া এবং সম্পদ দান করেছেন। আমি এর উপর সাওয়ার হয়ে আমার গন্তব্যে পৌঁছাব। তখন লোকটি তাকে বলল, আমার উপর বহু দায়িত্ব রয়েছে। তখন ফেরেশতা তাকে বললেন, সম্ভবত আমি তোমাকে চিনি। তুমি কি এক সময় শ্বেতরোগী ছিলে না? মানুষ তোমাকে ঘৃণা করত। তুমি কি ফকীর ছিলে না? অতঃপর আল্লাহ্ তাআলা তোমাকে দান করেছেন। তখন সে বলল, আমি তো এ সম্পদ আমার পূর্বপুরুষ হতে ওয়ারিশ সূত্রে পেয়েছি। ফেরেশতা বললেন, তুমি যদি মিথ্যাচারী হও, তবে আল্লাহ্ তোমাকে সেরূপ করে দিন, যেমন তুমি ছিলে।

অতঃপর ফেরেশতা মাথায় টাকওয়ালার নিকট তাঁর সেই বেশভূষা ও আকৃতিতে গেলেন এবং তাকে ঠিক তেমনই বললেন, যেরূপ তিনি শ্বেত রোগীকে বলেছিলেন। এও তাকে ঠিক অনুরূপ জবাব দিল যেমন জবাব দিয়েছিল শ্বেতরোগী। তখন ফেরেশতা বললেন, যদি তুমি মিথ্যাচারী হও, তবে আল্লাহ্ তোমাকে তেমন অবস্থায় করে দিন, যেমন তুমি ছিলে।

শেষে ফেরেশতা অন্ধ লোকটির নিকট তাঁর আকৃতিতে আসলেন এবং বললেন, আমি একজন নিঃস্ব লোক, মুসাফির মানুষ; আমার সফরের সকল সম্বল শেষ হয়ে গেছে। আজ বাড়ি পৌঁছার ব্যাপারে আল্লাহ্ ব্যতীত কোন গতি নেই। তাই আমি তোমার নিকট সেই সত্তার নামে একটি ছাগী প্রার্থনা করছি যিনি তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন আর আমি এ ছাগীটি নিয়ে আমার এ সফরে বাড়ি পৌঁছতে পারব। সে বলল, প্রকৃতপক্ষেই আমি অন্ধ ছিলাম। আল্লাহ্ আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমি ফকীর ছিলাম। আল্লাহ্ আমাকে সম্পদশালী করেছেন। এখন তুমি যা চাও নিয়ে যাও। আল্লাহ্‌র কসম। আল্লাহ্‌র জন্য তুমি যা কিছু নিবে, তার জন্যে আজ আমি তোমার নিকট কোন প্রশংসাই দাবী করব না। তখন ফেরেশতা বললেন, তোমার সম্পদ তুমি রেখে দাও। তোমাদের তিন জনের পরীক্ষা নেয়া হল মাত্র। আল্লাহ্ তোমার উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তোমার সাথীদ্বয়ের উপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন।

[বুখারী পর্ব ৬০ অধ্যায় ৫১ হাদীস নং ৩৪৬৪; মুসলিম ২৯৬৪]; সংসারের প্রতি অনাসক্তি – এই হাদীসটির তাহক্কিকঃ সহীহ হাদীস


১৮৬৯. সাদ ইবনি আবু ওয়াক্কাস [রাদি.] থেকে বর্ণিতঃ

আমিই আরবের সর্বপ্রথম ব্যক্তি, আল্লাহ্‌র পথে যে তীর নিক্ষেপ করেছে। আমরা যুদ্ধকালীন এমন অবস্থায় দেখেছি নিজেদেরকে যে দুবলাহ গাছের পাতা ও বাবলা ব্যতীত খাবারের কিছুই ছিল না। কেউ কেউ বকরীর পায়খানার মত পায়খানা করতেন। যা ছিল সম্পূর্ণ শুকনো। অথচ এখন আবার বনূ আসাদ [গোত্র] এসে ইসলামের উপর চলার জন্য আমাকে তিরস্কার করছে। এখন আমি যেন শংকিত আমার সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ।

[বুখারী পর্ব ৮১ অধ্যায় ১৭ হাদীস নং ৬৪৫৩; মুসলিম পর্ব ৫৩/হাঃ ২৯৬৬]; সংসারের প্রতি অনাসক্তি – এই হাদীসটির তাহক্কিকঃ সহীহ হাদীস


১৮৭০. আবু হুরাইরাহ [রাদি.] থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ্ [সাঃআঃ] দুআ করতেনঃহে আল্লাহ্! মুহাম্মাদ -এর পরিবারকে প্রয়োজনীয় জীবিকা দান করুন।

[বুখারী পর্ব ৮১ অধ্যায় ১৭ হাদীস নং ৬৪৬০; মুসলিম ১২/৪৩, হাঃ ১০৫৫]; সংসারের প্রতি অনাসক্তি – এই হাদীসটির তাহক্কিকঃ সহীহ হাদীস


১৮৭১. আয়িশাহ [রাদি.] থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, নাবী [সাঃআঃ] মাদীনায় আসার পর থেকে ইন্তিকাল পর্যন্ত তাঁর পরিবারের লোকেরা একাধারে তিন রাত গমের রুটি পেট ভরে খাননি।

[বুখারী পর্ব ৭০ অধ্যায় ২৩ হাদীস নং ৫৪১৬; মুসলিম পর্ব ৫৩/হাঃ ২৯৭০]; সংসারের প্রতি অনাসক্তি – এই হাদীসটির তাহক্কিকঃ সহীহ হাদীস


১৮৭২. আয়িশাহ [রাদি.] থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, মুহাম্মাদ [সাঃআঃ]-এর পরিবার একদিনে যখনই দুবেলা খানা খেয়েছেন একবেলা শুধু খুরমা খেয়েছেন।

[বুখারী পর্ব ৮১ অধ্যায় ১৭ হাদীস নং ৬৪৫৫; মুসলিম ২৯৭১]। সংসারের প্রতি অনাসক্তি – এই হাদীসটির তাহক্কিকঃ সহীহ হাদীস


১৮৭৩। আয়িশাহ [রাদি.] থেকে বর্ণিতঃ

তিনি একবার উরওয়াহ [রাদি.]-র উদ্দেশে বললেন, ভাগ্নে! আমরা [মাসের] নতুন চাঁদ দেখতাম, আবার নতুন চাঁদ দেখতাম। এভাবে দুমাসে তিনটি নতুন চাঁদ দেখতাম। কিন্তু রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ]-এর কোন ঘরেই আগুন জ্বালানো হত না।

[উরওয়াহ বলেন] আমি জিজ্ঞেস করলাম, খালা। আপনারা তাহলে বেঁচে থাকতেন কিভাবে? তিনি বললেন, দুটি কালো জিনিস অর্থাৎ খেজুর আর পানিই শুধু আমাদের বাঁচিয়ে রাখত। কয়েক ঘর আনসার রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ]-এর প্রতিবেশী ছিল। তাঁদের কিছু দুগ্ধবতী উটনী ও বকরী ছিল। তাঁরা রসূলুল্লাহ [সাঃআঃ]-এর জন্য দুধ হাদিয়া পাঠাত। তিনি আমাদের তা পান করতে দিতেন।

[বুখারী পর্ব ৫১ অধ্যায় ১ হাদীস নং ২৫৬৭; মুসলিম ৫৩/১ হাঃ ২৯৭২]। সংসারের প্রতি অনাসক্তি – এই হাদীসটির তাহক্কিকঃ সহীহ হাদীস


১৮৭৪। আয়িশাহ [রাদি.] থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেনঃ নাবী [সাঃআঃ]-এর ইন্তিকাল হল। সে সময় আমরা পরিতৃপ্ত হয়ে খেজুর ও পানি খেলাম।

[বুখারী পর্ব ৭০ অধ্যায় ৬ হাদীস নং ৫৩৮৩; মুসলিম ২৯৭৫]। সংসারের প্রতি অনাসক্তি – এই হাদীসটির তাহক্কিকঃ সহীহ হাদীস


১৮৭৫। আবু হুরাইরাহ [রাদি.] থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, মুহাম্মাদ [সাঃআঃ]এর পরিবার তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত একাধারে তিনদিন আহার করে পরিতৃপ্ত হননি।

[বুখারী পর্ব ৭০ অধ্যায় ১ হাদীস নং ৫৩৭৪; মুসলিম ২৯৭৬]। সংসারের প্রতি অনাসক্তি – এই হাদীসটির তাহক্কিকঃ সহীহ হাদীস

Was this article helpful?

Related Articles