যিক্‌রের গুরুত্ব ও এ ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান করা

যিকির আয্‌কার

যিকিরের ফযীলত ও এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করা

আল্লাহ তায়ালা বলেছেনঃ

“আর আল্লাহর যিকির অনেক বড়।” (সূরা আনকাবুতঃ ৪৫)

তিনি আরো বলেছেনঃ

“তোমরা আমার স্মরণ কর আমিও তোমাদের স্মরণ করব।” (সূরা বাকারাঃ ১৫২)

তিনি আরো বলেছেনঃ

“তোমাদের প্রভুকে স্মরণ কর মনের মধ্যে দিনতার সাথে ও ভীতি সহকারে এবং উচ্চ আওয়াজের পরিবর্তে নিম্ন স্বরে সকাল-সন্ধায় (অর্থাৎ সর্বক্ষণ) আর তোমরা গাফেলদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (সূরা আরাফঃ ২০৫)

তিনি আরো বলেছেনঃ

“আর বেশি করে আল্লাহকে  স্মরণ কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (সূরা জুমুআঃ ১০)

তিনি আরো বলেছেনঃ

“নিশ্চয় মুসলমান পুরুষ, মুসলমান নারী, ঈমানদার পুরুষ, ঈমানদার নারী, অনুগত পুরুষ, অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ, সত্যবাদী নারী, ধৈর্য্যশীল পুরুষ, ধৈর্য্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ, বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ, দানশীল নারী, রোযা পালণকারী পুরুষ, রোযা পালনকারী নারী, যৌনাঙ্গ হেফাযতকারী পুরুষ, , যৌনাঙ্গ হেফাযতকারী নারী, আল্লাহর অধিক যিকরকারী পুরুষ ও যিকরকারী নারী-তাদের জন্য আল্লাহ প্রস্তুত রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপুরষ্কার।” (সূরা আহযাবঃ ৩৫)

তিনি আরো বলেছেনঃ

“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে বেশি বেশি করে স্মরন কর এবং সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা কর।” (সূরা আহযাবঃ ৪১-৪২)

এই পরিচ্ছেদের সাথে সম্পর্কিত অসংখ্য আয়াত কুরআনে পাওয়া যায়।

 

১৪০৯. হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ এমন দু’টি বাক্য আছে, যা মুখে উচ্চারণে হালকা, পাল্লায় (ওযনে) ভারী এবং আল্লাহর কাছে প্রিয়। তা হলঃ “সুবহানাল্লাহ, ওয়াল হামদু লিল্লাহ, ওয়া লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আল্লাহু আকবার বলা দুনিয়ার সব কিছু থেকে বেশি প্রিয়।” (বুখারী ও মুসলিম)


১৪১০. হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ “সুবহানাল্লাহ, ওয়াল হামদু লিল্লাহ, ওয়া লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আল্লাহু আকবার” বলা আমার নিকট দুনিয়ার ঐ সমস্ত জিনিস হতে প্রিয় যার উপর সূর্য উদিত হয়, (আর্থাৎ দুনিয়ার সব কিছু থেকে)। (মুসলিম)


১৪১১. হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি প্রতিদিন ১০০ বার “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা- শারীকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়্যিন ক্বাদীর – (অর্থঃ আল্লাহ ছাড়া আর কোন সত্যিকার ইলাহ নেই তিনি এক। তাঁর কোন শরীক নেই, সমস্ত প্রশংসা তাঁর। তিনি সমস্ত বস্তুর উপর শক্তিশালী) বলবে, সে দশটি গোলাম আযাদ করার সমান সাওয়াব লাভ করবে। আর তার নামে লেখা হবে ১০০টি নেকী এবং তার নাম থেকে ১০০টি গুনাহ মুছে ফেলা হবে। আর সে সেদিন সন্ধ্যা হওয়া পর্যন্ত শয়তানের প্ররোচনা থেকে সংরক্ষিত থাকবে এবং কিয়ামতের দিন কেউ তার অপেক্ষা ভালো আমল আনতে পারবে না, একমাত্র সেই ব্যক্তি ব্যতীত যে তার অপেক্ষা বেশি আমল করেছে। তিনি আরো বলেছেন যে ব্যক্তি প্রতিদিন ১০০ বার “সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি ” বলবেঃ তার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে, যদিও তা সমুদ্রের ফেনাপুঞ্জের সমতুল্য হয়। (বুখারী ও মুসলিম)


১৪১২. হযরত আবূ আইয়ুব আল আনসারী (রাঃ) নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ যে ব্যক্তি ১০ বার “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌দাহু লা-শারীকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হাম্‌দু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়্যিন ক্বাদীর” বলবে, সে যেন ইসমাইল (আঃ)- এর বংশের চারটি সন্তানকে গোলামী থেকে মুক্তি দান করলো। তথ্যসূত্রঃ (বুখারী ও মুসলিম)


১৪১৩. হযরত আবু যার (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বলেছেনঃ আল্লাহ্‌র নিকট যে কথাটি সর্বাপেক্ষা প্রিয় সেটি কি আমি তোমাকে জানাবো না? নিঃসন্দেহে আল্লাহ্‌র নিকট সর্বাপেক্ষা প্রিয় কথাটি হচ্ছেঃ ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি।” তথ্যসূত্রঃ (মুসলিম)


১৪১৪. হযরত আবু মালিক আল আশ’আরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ তাহারাত বা পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক। আর “আলহামদু লিল্লাহ্‌” বাক্যটি মীযান (দাড়িপাল্লা) ভরে দেয় এবং “সুবহান্নাল্লাহ ওয়াল হাম্‌দুলিল্লাহ” বাক্য দু’টি ভরে দেয় বা এদের প্রত্যেকটি ভরে দেয় আসমানসমূহ ও যমীনের মধ্যবর্তী সবটুকু।” তথ্যসূত্রঃ (মুসলিম)


১৪১৫. হযরত সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ একজন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম- এর দরবারে এসে বললোঃ আমাকে এমন কোন কালেমা শিখিয়ে দিন যা আমি পড়তে থাকবো। তিনি বললেনঃ “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকা লাহু, আল্লাহু আকবার কাবীরান ওয়াল হামদু লিল্লাহ কাসীরান, ওয়া সুবহানাল্লাহি রাব্বিল আ-লামীন ওয়া লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহিল আযীযিল হাকীম” বল। বেদুঈন লোকটি আরয করেনঃ এসব কালেমা তো হলো আমার রবের জন্য, এখন আমার জন্য কি আছে? তিনি বললেনঃ তুমি বলতে থাক, “আল্লাহুম্মাগ ফিরলী ওয়ারহামনী ওয়ার যুকনী’ অর্থঃ হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন, আমার ওপর করুণা করুন, আমাকে হিদায়াত করুন এবং আমাকে রিযিক দান করুন।” (মুসলিম)


১৪১৬. হযরত সাওবান (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) যখন নামায শেষ করতেন তখন তিনবার ইস্তিগফার করতেন এবং (তারপর) বলতেনঃ “আল্লাহুম্মা আনতাস সালাম, ওয়া মিনকাস সালাম, তাবারাকতা ইয়া যাল জালালি ওয়াল ইকরাম।” ইমাম আওযায়ীকে (যিনি এই হাদীসটির একজন বর্ণনাকারী) জিজ্ঞেস করা হলো, (তাঁর) ইস্তিগফার কেমন ছিল? তিনি বললেন, রাসূলু্‌ল্লাহ (সা) বলতেনঃ “আসতাগফিরুল্লাহ, আসতাগফিরুল্লাহ।”    (মুসলিম)


১৪১৭. হযরত মুগীরা ইবনে শু’বা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) যখন নামায শেষ করতেন এবং সালাম ফিরাতেন তখন বলতেনঃ “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকা লাহু, লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়্যিন কাদীর। আল্লাহুম্মা লা মানিয়া লিমা আতাইতা, ওয়া লা মু’তীয়া লিমা মানা’তা, ওয়া লা ইয়ানফাউ যাল জাদ্দি মিনকাল জাদ্দ- অর্থঃ আল্লাহ ব্যতীত কোন মাবুদ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই, রাজত্ব তাঁরই এবং প্রশংসাও তাঁর আর তিনি সব বস্তুর ওপর ক্ষমতাবান। হে আল্লাহ! আপনি যা দিয়েছেন তা রোধ করার কেউ নেই আর আপনি যা রোধ করেন তা দান করার সাধ্য কারোর নেই। আর ধনবানকে তার ধন আযাবের মুকাবিলায় কোন উপকার করতে পারে না।” (বুখারী ও মুসলিম)


১৪১৮. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, তিনি প্রত্যেক নামায শেষে সালাম ফেরাবার পর পড়তেনঃ অর্থঃ আল্লাহ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই। রাজত্ব তাঁরই এবং প্রশংসা তাঁরই জন্য আর তিনি সবকিছুর ওপর শক্তিশালী, আল্লাহ প্রদত্ত শক্তি ব্যতীত গুনাহ থেকে বিরত থাকার এবং ইবাদত করার শক্তি কারোর নেই। আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। আমরা তাঁর ব্যতীত আর কারোর ইবাদত করি না। সমস্ত অনুগ্রহ ও শ্রেষ্ঠত্ব তাঁরই। সমস্ত সুন্দর ও ভালো প্রশংসা তাঁরই জন্য। তিনি ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই। আমরা দীনকে একমাত্র তাঁরই জন্য নির্ধারিত করে নিয়েছি, যদিও কাফিরদের নিকট তা অপছন্দ।” ইবনে যুবাইর (রা) বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সা) প্রত্যেক নামায শেষে এ বাক্যগুলো তাহলীল হিসেবে পাঠ করতেন। (মুসলিম)


১৪১৯. হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, একবার দরিদ্র মুহাজিররা রাসূলু্‌ল্লাহ (সা)-এর নিকট এসে বললেনঃ ধনবানরা তো সমস্ত বড় মর্যাদাগুলো দখল করে নিলেন এবং স্থায়ী নিয়ামতগুলো তাদের ভাগে পড়ল। আমরা যেমন নামায পড়ি তারাও তেমনি নামায পড়ে, আমরা যেমন রোযা রাখি তারাও তেমনি রোযা রাখে, কিন্তু ধন-সম্পদের দিক থেকে তারা আমাদের অপেক্ষা অগ্রসর। ফলে তারা হজ্জ করে, উমরা করে, আবার জিহাদ করে এবং সাদকাও করে। তিনি বললেনঃ আমি কি তোমাদেরকে এমন বস্তু শিক্ষা দেবো না? যার ওপর আমল করে তোমরা নিজেদের অপেক্ষা অগ্রবর্তীদেরকে ধরে ফেলবে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদের থেকেও এগিয়ে যাবে, আর তোমাদের মতো ঐ আমলগুলো না করা পর্যন্ত কেউ তোমাদের অপেক্ষা অগ্রবর্তী হবে না। তারা বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! অবশ্যই বলে দিন। তিনি বললেনঃ তোমরা প্রত্যেক নামাযের পর ৩৩ বার তাসবীহ, তাহমীদ ও তাকবীর পড়ো। বর্ণনাকারী আবু সালিহ সাহাবী (র) হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, যখন তাঁকে ঐ কালেমাগুলো পড়ার নিয়ম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি বললেনঃ এ কালেমাগুলো সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “সুবহানাল্লাহ, ওয়াল হামদুলিল্লাহ ওয়াল্লাহু আকবার” অবশেষে এ প্রত্যেকটি কালেমাই হবে ৩৩ বার।   (বুখারী ও মুসলিম)

ইমাম মুসলিমের রিয়ায়াতে আরও আছে যে, দরিদ্র মুহাজিরগণ পুনরায় রাসূল (সা) –এর খেদমতে হাযির হয়ে বললেন, আমরা যা কিছু করছিলাম আমাদের ধনী ভাইরা তা শুনে নিয়েছে এবং তারাও তা করতে শুরু করেছে। রাসূল (সা) বললেনঃ এটা হচ্ছে আল্লাহর ফযল, যাকে ইচ্ছা তাকে তিনি তা দান করেন।


১৪২০. হযরত আবু হুরাইরা (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ যে ব্যক্তি প্রত্যেক নামাযের পর ৩৩ বার ‘সুবহানাল্লাহ’ ৩৩ বার ‘আল হামদুলিল্লাহ’ ৩৩ বার ‘আল্লাহু আকবার’ পড়ে এবং ১০০ বার পূর্ণ করার জন্য একবার “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা-শারীকালাহু লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুওয়া আলা কুল্লি শাইয়্যিন কাদীর” পড়ে, তার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়, যদিও তা সাগরের ফেনাপুঞ্জের সমতুল্য হয়। (মুসলিম)


১৪২১. হযরত কা’ব ইবনে উজরাহ (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, (নামাযের) পরে পঠিত কয়েকটি কালেমা এমন আছে যেগুলো পাঠকারী অথবা (বলেন) সম্পাদনকারী ব্যর্থ হয় না। সে কালেমাগুলো হচ্ছেঃ প্রত্যেক ফরয নামাযের পর ৩৩ বার ‘সুবহানাল্লাহ’ ৩৩ বার ‘আল হামদুলিল্লাহ’ ও ৩৪ বার ‘আল্লাহু আকবার’। (মুসলিম)


১৪২২. হযরত সা’দ ইবনে আবু ওয়াককাস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) প্রত্যেক নামাযের পর এ বাক্যগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করতেনঃ অর্থ- হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি ব্যর্থতা ও কৃপণতা থেকে। আর আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি আমাকে বয়সের এমন পর্যায়ের দিকে ঠেলে দেয়া থেকে যে পর্যায়ে মানুষ অর্থব হয়ে যায়। আর আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি দুনিয়ার ফিতনা থেকে এবং আশ্রয় প্রার্থনা করছি কবরের ফিতনা থেকে।” (বুখারী)


১৪২৩. হযরত মু’আয (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) একদিন তাঁর হাত ধরে বললেনঃ হে মু’আয! আল্লাহর কসম, আমি অবশ্যই তোমাকে ভালোবাসি। তারপর বললেনঃ হে মু’আয! আমি তোমাকে ওসিয়ত করছি ও প্রত্যেক নামাযের পর নিম্নোক্ত কালেমাগুলো পড়োঃ অর্থ-হে আল্লাহ! তোমার যিকির, শোকর ও সর্বাঙ্গ সুন্দর ইবাদতের ক্ষেত্রে তুমি আমায় সহায়তা করো। (আবু দাউদ)


১৪২৪. হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যখন তাশাহহুদ পাঠ করবে, তখন তার আল্লাহর নিকট ৪টি বিষয় থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা উচিতঃ সে বলবে, অর্থ – হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি জাহান্নামের আযাব থেকে, কবরের আযাব থেকে, জীবন ও মৃত্যুর আযাব থেকে এবং মাসীহের দাজ্জাল অর্থাৎ যে প্রতারক ঈসা (আ)-এর হাতে নিহত হবে তার ফিতনা থেকে।  (মুসলিম)


১৪২৫. হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) যখন নামাযে দাঁড়াতেন, তখন তাশাহহুদ ও সালামের মাঝখানে তিনি যা পাঠ করতেন, তা হচ্ছে- অর্থঃ হে আল্লাহ! আমার সে গুনাহগুলো ক্ষমা করে দিন, যেগুলো আমি পূর্বে করেছি এবং যেগুলো আমি পরে করেছি আর যেগুলো আমি গোপনে করেছি, যেগুলো প্রকাশ্যে করেছি এবং আমি যা কিছু বাড়াবাড়ি করেছি আর সেই গুনাহও যা সম্পর্কে আমার অপেক্ষা আপনিই বেশি জানেন। আপনিই অগ্রসরকারী এবং আপনিই পিছিয়ে দেবার ক্ষমতা সম্পন্ন। আপনি ব্যতীত আর কোন মা’বুদ নেই।”  (মুসলিম)


১৪২৬. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ নবী করীম (সা) নিজের রুকু ও সিজদার মধ্যে “সুবহানাকাল্লাহুম্মা রাব্বানা ওয়া বিহামদিকা আল্লাহুম্মাগফির লী।” অর্থঃ হে আল্লাহ! আপনি পবিত্র আমাদের প্রতিপালক এবং প্রশংসা আপনারই। হে আল্লাহ! আমাকে মাফ করে দিন, বেশি পড়তেন। (বুখারী ও মুসলিম)


১৪২৭. হযরত আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর (নফল নামাযের) রুকু ও সিজদার মধ্যে নিম্নোক্ত দু’আটি বলতেনঃ “সুব্বুহুন কুদ্দুসুন রাব্বুর মালা- ইকাতি ওয়ার রুহ্‌।” (মুসলিম)


১৪২৮. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ রুকুতে নিজের রবের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা কর আর সিজদায় দু’আ করার চেষ্টা কর। কারণ তা তোমাদের জন্য কবুল হওয়াই সংগত। (মুসলিম)


১৪২৯. আবু হুরাইরা (রা)থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ “বান্দা যখন সিজদায় থাকে তখনই সে তার রবের সর্বাপেক্ষা নিকটবর্তী হয়। কাজেই (সিজদায়) বেশি করে দু’আ কর।” (মুসলিম)


১৪৩০. আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর (নফল নামাযের) সিজদায় বলতেনঃ অর্থ- “হে আল্লাহ! আমার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিন, ছোট-বড়, আগের-পরের এবং গোপন- প্রকাশ্য সব গুনাহ।”  (মুসলিম)


১৪৩১. হযরত আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ এক রাতে আমি নবী কারীম (সাঃ) কে বিছানায় পেলাম না। আমি তাঁকে খুঁজতে লাগলাম। আমি দেখতে পেলাম তিনি রুকু অথবা সিজদায় গিয়ে বলছেনঃ “সুবহানাকা ওয়াবিহামদিকা লা ইলাহা ইল্লা আন্তা।” অন্য এক বর্ণনায় আছেঃ আমি শায়িত অবস্থায় তাঁকে খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম এমন সময় আমার হাত তাঁর পায়ের তলায় গিয়ে পড়লো। তখন তিনি সিজদায় ছিলেন এবং তাঁর দুটি পায়ের পাতা খাড়া অবস্থায় ছিল। তিনি সিজদায় বলছিলেনঃ অর্থ- হে আল্লাহ! আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি আপনার রেযামন্দির মাধ্যমে আপনার ক্রোধ থেকে, আপনার নিরাপত্তার মাধ্যমে আপনার শাস্তি থেকে এবং আপনার রহমতের মাধ্যমে আপনার কঠোরতা থেকে। আপনার প্রশংসা গণনা করতে আমি অপারগ। আপনি ঠিক তেমনি যেমন আপনি নিজের প্রশংসায় বলেছেন।” (মুসলিম)


১৪৩২. হযরত সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ এক সময় আমরা রাসূল (সা)-এর নিকট ছিলাম। এ সময় তিনি বললেনঃ তোমাদের কেউ কি প্রতিদিন ১০০০টি নেকী অর্জন করতে অক্ষম? তাঁর সাথে বসা সাহাবীগণের মধ্যে হতে একজন জিজ্ঞেস করেনঃ কেমন করে সে ১০০০টি নেকী অর্জন করবে? তিনি বললেনঃ সে ১০০ বার ‘সুবহানাল্লাহ’ পড়বে। এতে তার নামে ১০০০টি নেকী লেখা হবে অথবা তার ১০০০ গুনাহ মুছে ফেলা হবে। (মুসলিম)


১৪৩৩. হযরত আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ ভোরে তোমাদের প্রত্যেকের দেহের প্রতিটি জোড়ার ওপর সাদাকা ওয়াজিব হয়। অতপর প্রত্যেকবার ‘সুবহা-নাল্লাহু’ বলা একটি সাদাকা, প্রত্যেকবার ‘তাকবীর’ বলা একটি সাদাকা, প্রত্যেকবার ‘আল্লহু আকবর’ বলা একটি সাদাকা, প্রত্যেকবার ‘তাকবীর’ বলা একটি সাদাকা, ভালো কাজে আদেশ করা আর একটি সাদাকা এবং মন্দ কাজ করতে নিষেধ করা একটি সদকা। আর যে ব্যক্তি চাশতের দু’ রাত’আত নামায পড়বে তা এই সবের জন্য যথেষ্ট হবে। (মুসলিম)


১৪৩৪. হযরত উম্মুল মু’মিনীন জুওয়াইরিয়া বিনতিল হারিস (রা) থেকে বর্ণিত। নবী করীম (সা) সকালে নামায পড়ার পর তার নিকট থেকে বের হলেন। তিনি তখন নিজের নামাযের জায়গায় বসাবস্থায় ছিলেন। তারপর নবী করীম (সা) আবার চাশতের পর ফিরে এলেন। তখনো তিনি বসাবস্থায় ছিলেন। অতঃপর তিনি বললেন, আমি তোমাকে যে অবস্থায় রেখে গিয়েছিলাম সেই একই অবস্থায় তুমি বসে রয়েছো? তিনি জবাব দিলেনঃ জি হ্যাঁ। নবী করীম (সা) বললেনঃ আমি তোমার এখান থেকে যাওয়ার পর এমন চারটি কালেমা তিনবার পড়েছি যা তুমি আজ যা কিছু পড়েছো তার সাথে যদি ওজন করা যায় তাহলে সেই চারটি কলেমা অনেক ভারী হবে। সেই কালেমাগুলো হচ্ছেঃ “সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী, আদাদ খালকিহি, ওয়া রিদা নাফসিহি, ওয়া যিনাতা আরশিহী, ওয়া মিদাদা কালিমাতিহি” অর্থ- আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করছি এবং তাঁর প্রশংসা করছি, তাঁর সৃষ্টির সমান সংখ্যক, তাঁর মর্জি অনুযায়ী, তাঁর আরশের ওজনের সমান এবং তাঁর বাক্যাবলীর সমান সংখ্যা।” (মুসলিম)

মুসলিমের অন্য বর্ণনায় আছে, “সুবহানল্লাহি আদাদা খালকিহি, সুবহানাল্লাহি রিদা নাফসিফী, সুবহানাল্লাহি যিনাতা আরশিহী, সুবহানাল্লাহি মিদাদা কালিমাতিহী।”

তিরমিযির বর্ণনায় আছে, আমি কি তোমাকে এমন সব কালেমা শিখাবো না, যা তুমি পড়তে থাকবে? সে কালেমাগুলো হচ্ছেঃ “সুবহানাল্লাহি আদাদা খালকিহী, সুবহানাল্লাহি আদাদা খালকিহী, সুবহানাল্লাহি আদাদা খালকিহী, সুবহানাল্লাহি রিদা নাফসিহী, সুবহানাল্লাহি রিদা নাফসিহী, সুবহানাল্লাহি রিদা নাফসিহী, সুবহানাল্লাহি যিনাতা আরশিহী, সুবহানাল্লাহি যিনাতা আরশিহী, সুবহানাল্লাহি যিনাতা আরশিহী, সুবহানাল্লাহি মিদাদা কালিমাতিহী, সুবহানাল্লাহি মিদাদা কালিমাতিহী, সুবহানাল্লাহি মিদাদা কালিমাতিহী।”


১৪৩৫. হযরত আবু মূসা আল আশ’আরী (রা) নবী করীম (সা) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার রবের যিকর (স্মরণ) করে আর যে ব্যক্তি তার রবের স্মরণ করে না তাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে জীবিত ও মৃতের ন্যায়।” (বুখারী)


১৪৩৬. আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ আল্লাহ তা’আলা বলেছেনঃ আমার বান্দা আমার সম্পর্কে যেমন ধারণ করে আমি ঠিক তেমন। আর সে যখন আমাকে স্মরণ করে তখন আমি তার সাথে থাকি। যদি সে মনে মনে আমাকে স্মরণ করে আমিও আমার মনের মধ্যে তাকে স্মরণ করি। আর যদি সে কোন সমাবেশে আমাকে স্মরণ করে তবে আমি তাকে স্মরণ করি এমন সমাবেশে যা তার থেকে উত্তম। (বুখারী ও মুসলিম)


১৪৩৭. হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ “মুফাররিদরা” অগ্রবর্তী হয়ে গেছে। সাহাবা কিরাম (রা) বললেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! মুফাররিদ কারা? তিনি বললেনঃ “যে সকল নারী পুরুষেরা খুব বেশি আল্লাহর যিকির করেন।” (মুসলিম)


১৪৩৮. হযরত জাবির (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছিঃ “সর্বোত্তম যিকর হচ্ছে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।” (তিরমিযী) ইমাম তিরমিযী বলেন, হাদীসটি হাসান।


১৪৩৯. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে বাসর (রা) থেকে বর্ণিত। এক ব্যক্তি আরয করেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! ইসলামের আহকাম আমার জন্য অনেক বেশি হয়ে গেছে। কাজেই আপনি আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলে দিন যেটাকে আমি শক্ত করে আঁকড়ে ধরবো। তিনি বললেনঃ “তোমার জিহ্বাকে সর্বক্ষণ আল্লাহর যিকরে সিক্ত রাখ।” (তিরমিযী) ইমাম তিরমিযী বলেছেন, হাদীসটি হাসান।


১৪৪০. হযরত জাবির (রা) নবী করীম (সা) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ যে ব্যক্তি বলে ‘সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি’ তার জন্য জান্নাতে একটি খেজুরের গাছ লাগানো হয়। (তিরমিযী)


১৪৪১. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ যে রাতে আমার মি’রাজ হয় সে রাতে আমি ইবরাহীম (সা) ওয়া সাল্লামের সাথে সাক্ষাৎ করলাম। তিনি বললেনঃ “হে মুহাম্মাদ! আমার পক্ষ থেকে তোমার উম্মাতকে সালাম পৌঁছাবে এবং তাদেরকে জানাবে যে, জান্নাতে রয়েছে পবিত্র মাটি ও মিষ্টি পানি এবং তা হচ্ছে একটি বৃক্ষলতাহীন ধূ ধূ প্রান্তর। আর তার বৃক্ষলতা হচ্ছেঃ “সুবহানাল্লাহ ওয়াল হামদুলিল্লাহু, ওয়া লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার।’’  (তিরমিযী)


১৪৪২. হযরত আবু দারদা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ আমি কি তোমাদেরকে উত্তম আমলের কথা জানাবো না? যা অত্যন্ত পবিত্র তোমাদের প্রভুর নিকট, যা তোমাদের মর্যাদার দিক থেকে অনেক বেশি উঁচু এবং তোমাদের জন্য সোনা ও রূপা খরচ করা অপেক্ষা অনেক উত্তম আর তোমরা নিজেদের শত্রুদের মুখোমুখি হবে তারপর তোমরা তাদেরকে হত্যা করবে বা তারা তোমাদেরকে হত্যা করবে- এর অপেক্ষা অনেক বেশি ভালো? সাহাবা কিরাম (রা) বললেনঃ হ্যাঁ, অবশ্য বলুন। তিনি বললেনঃ (তা হচ্ছে) আল্লাহ তা’আলার যিকর। (তিরমিযী)


১৪৪৩. হযরত সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে এক মহিলার কাছে গেলেন। তখন তাঁর সামনে ছিল খেজুরের বীচি অথবা কাঁকর। তিনি সেগুলোর সাহায্যে তাসবীহ গণনা করছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেনঃ আমি কি তোমাকে এমন বস্তুর কথা জানাবো যা তোমার জন্য এটা অপেক্ষা সহজ অথবা এটা অপেক্ষা উত্তম হবে। আর তা হচ্ছে এরূপ বলবেঃ অর্থ- “আমি আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করছি সেই সব বস্তুর সমান সংখ্যক যা তিনি আসমানে সৃষ্টি করেছেন।, আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করছি সেই সব বস্তুর সমান সংখ্যক যা তিনি পৃথিবীতে সৃষ্টি করেছেন। পবিত্রতা বর্ণনা করছি সেই সব বস্তুর সমান যা ঐ দু’টির মাঝখানে আছে। পবিত্রতা বর্ণনা করছি সেইসব বস্তুর সমান সংখ্যক যার তিনি স্রষ্টা।” আর “আল্লাহু আকবার” বাক্যটিও এভাবে পড়, “আল-হামদুলিল্লাহ” বাক্যটিও এভাবে পড়, “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বাক্যটিও এভাবে পড়ো এবং “লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ” বাক্যটিও এভাবে পড়।  (তিরমিযী)


১৪৪৪. হযরত আবু মূসা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ আমি কি তোমাকে জান্নাতের কোন গুপ্তধনের কথা জানাবো না”? আমি বললামঃ অবশ্যই জানান, ইয়া রাসূলুল্লাহ! তিনি বললেনঃ সে গুপ্ত ধনটি হচ্ছে “লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।” (বুখারী ও মুসলিম)


 

Was this article helpful?

Related Articles

Leave A Comment?