মুসলমানদের মান-সম্মানের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন, তাদের অধিকার হেফাজত এবং তাদের প্রতি স্নেহ ও দয়া প্রদর্শনের বিবরণ

মুসলমানদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনতাদের অধিকারসমূহের সুরক্ষা এবং তাদের প্রতি দয়া-মায়া ও ভালোবাসা পোষণ

মহান আল্লাহ বলেনঃ

‘যে ব্যক্তি আল্লাহর নির্ধারিত সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করবে, সেটা তার নিজের জন্যেই তার প্রভুর নিকট অত্যন্ত কল্যাণকর প্রমাণিত হবে।’ (সূরা হজ্জঃ ৩০)

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ

‘যে ব্যক্তি আল্লাহর নিদর্শনাবলীর প্রতি সম্মান দেখাবে; আর এটা হলো (সম্মান দেখানো) অন্তরের তাকওয়া। (সূরা আল-হজ্জঃ ৩২)

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ

মুমিনদের প্রতি তোমরা বিনয় ও নম্রতার ডানা প্রসারিত করো।   (সূরা আল হিজরঃ ৮৮)

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ

যদি কেউ অন্য কাউকে হত্যার অপরাধ কিংবা জমিনে বিপর্যয় সৃষ্টির অপরাধ ছাড়া (অন্যায়ভাবে) কাউকে হত্যা করে, তবে সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল। আর যদি কেউ অন্য কাউকে জীবন দান করে (অন্যায়ভাবে নিহত হবার কবল থেকে রক্ষা করে) তবে সে যেন গোটা মানবজাতিকে জীবন দান করল। (সূরা আল-মায়েদাঃ ৩২)

 

২২২. হযরত আবু মূসা আশ’আরী (রা) বলেন; রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ ‘এক মুমিন অন্য মুমিনের জন্য দেয়াল স্বরূপ। এর এক অংশ অপর অংশকে শক্তিমান করে।’ এ কথা বলার সময় তিনি (রাসূলে আকরাম) এক হাতের আঙ্গুলি অন্য হাতের অঙ্গুলির ফাঁকে ঢুকিয়ে দেখান। (বুখারী ও মুসলিম)


২২৩. হযরত আবু মূসা আশ’আরী বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ কোন ব্যক্তি যদি আমাদের মসজিদ কিংবা বাজারগুলো থেকে কোন জিনিস নিয়ে যায় এবং তার সাথে যদি এর ফলে কোন মুসলমানের দেহে আঘাত লাগার ভয় থাকবে না। (বুখারী ও মুসলিম)


২২৪. হযরত নূ’মান ইবনে বশীর বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ পারস্পারিক ভালোবাসা, দয়া-মায়া ও স্নেহ-মমতার দিক থেকে গোটা মুসলিম সমাজ একটি দেহের সমতুল্য। যদি দেহের কোন বিশেষ অঙ্গ অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাহলে অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গেও তা অনুভূত হয়; সেটা জাগ্রত অবস্থায়ই হোক কিংবা জ্বরাক্রান্ত অবস্থায় (অর্থ্যাৎ সর্বাবস্থায় একে অপরের সুখ-দুঃখের অংশীদার হয়)।   (বুখারী ও মুসলিম)


২২৫. হযরত আবু হুরাইরা (রা) বর্ণনা করেন, একদা রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ইবনে আলী (রা)-কে চুমু খেলেন। তখন আকরা’ ইবনে হাবেস (রা) তাঁর কাছেই ছিলেন। আকরা’ বললেনঃ আমার দশটি ছেলে আছে। কিন্তু আমি কখনও তাদের কাউকে চুমু খাইনি। রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকিয়ে বললেনঃ ‘যে ব্যক্তি দয়া প্রদর্শন করে না, সে দয়ার যোগ্য হতে পারে না। (বুখারী ও মুসলিম)


২২৬. হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, (একদা) কতিপয় আরব বেদুঈন রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এল। তারা জিজ্ঞেস করলঃ আপনারা কি আপনাদের ছোট শিশুদের চুমু দেন? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। তারা বললোঃ আল্লাহর কসম! আমরা কিন্তু শিশুদের চুমো দেই না। রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আল্লাহ যদি তোমাদের অন্তর থেকে রহমত ও দয়া-মায়া তুলে নিয়ে নেন, তাহলে আমি কি তার মালিক বা জিম্মাদার হতে পারি?  (বুখারী ও মুসলিম)


২২৭. হযরত জারীর ইবনে আবদুল্লাহ (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ ‘যে ব্যক্তি মানুষকে দয়া করে না, আল্লাহও তাকে দয়া করেন না।’  (বুখারী ও মুসলিম)


২২৮. হযরত আবু হুরাইরা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যখন নামাযে লোকদের ইমামতি করে, সে যেন নামায সংক্ষেপ করে। কেননা মুত্তাকীদের মধ্যে দুর্বল, রুগ্ন ও বৃদ্ধ লোক থাকতে পারে। (অবশ্য) তোমাদের কেউ যখন একাকী নামায পড়ে, তখন সে নিজ ইচ্ছামতো নামায লম্বা করতে পারে।  (বুখারী ও মুসলিম)


২২৯. হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন কাজ (ইবাদত) করার প্রবল আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও (মাঝে মাঝে) তা পরিহার করতেন এই ভয়ে যে, লোকেরা (তাঁর দেখাদেখি) তা নিয়মিত করতে থাকবে। পরিণামে এটা হয়তো তাদের ওপর ফরয করে দেয়া হবে। (বুখারী ও মুসলিম)


২৩০. হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে তাদেরকে ‘সওমে বিসাল’ (সামান্য পানাহর করে একাধারে দীর্ঘদিন রোযা পালন) করতে বারণ করেছেন। তাঁরা নিবেদন করলেনঃ আপনি যে এটা (সওমে বিসাল) করেন? তিনি বললেনঃ আমি তো তোমাদের মতো নই। আমি রাত যাপন করি আর আমার প্রভু আমায় পানাহার করান।  (বুখারী ও মুসলিম)


২৩১. হযরত আবু কাতাদা (রা)-এর বর্ণনা মতে, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আমি নামাযকে দীর্ঘায়িত করার আগ্রহ নিয়ে নামাযে দাঁড়াই। ইতোমধ্যে (হয়ত) আমি শিশুদের কান্নার আওয়ায শুনতে পাই। এ বিষয়টি মায়েদের অস্থির করে তুলতে পারে ভেবে আমি আমার নামায সংক্ষেপ করে দিই। (বুখারী)


২৩২. হযরত জুনদুব ইবনে আবদুল্লাহ বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যে ব্যক্তি সকালে (ফজরের) নামায আদায় করল, সে আল্লাহর জিম্মায় চলে গেল। (তোমাদের এরূপ অবস্থার মধ্যেই থাকা উচিত)।   আল্লাহ যেন তোমাদের কাছ থেকে তাঁর যিম্মার ব্যাপারে পুংখানুপুংখ হিসাব না চান। কেননা তাঁর যিম্মার ব্যাপারে তিনি যাকে পাকড়াও করতে চাইবেন, পাকড়াও করতে পারবেন। তারপর তাকে উপুড় করে জাহান্নামে ছুঁড়ে মারবেন।  (মুসলিম)


২৩৩. হযরত ইবনে উমর (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই। সে না তার ওপর জুলুম করতে পারে, আর না তাকে শত্রুর হাতে তুলে দিতে পারে। যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণে যত্নশীল হয়, আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করে দেন। যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের কোন কষ্ট বা সমস্যা দূর করে দেয়, আল্লাহ তার বিনিময়ে কিয়ামতের দিন তার কষ্ট ও বিপদ থেকে অংশ বিশেষ দূর করে দেবেন। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ গোপন রাখে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ গোপন রাখবেন।  (বুখারী ও মুসলিম)


  ২৩৪. হযরত আবু হুরাইরা (রা) বলেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে না তার সাথে বিশ্বাসভঙ্গ করতে পারে, না তাকে মিথ্যা বলতে পারে আর না তাকে হেয় প্রতিপন্ন করতে পারে। মূলত প্রত্যেক মুসলমানের মান-সভ্রম, ধন-সম্পদ ও রক্ত অন্য মুসলমানের ওপর হারাম। (তিনি আপন বক্ষস্থলের দিকে ইঙ্গিত করে বলেনঃ) তাকওয়া এখানে থাকে। কোন ব্যক্তির নষ্ট হওয়ার জন্যে এটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলমান ভাইকে ঘৃনা করে, তাকে হেয় প্রতিপন্ন করতে সচেষ্ট থাকে। (তিরমিযী)


    ২৩৫. হযরত আবু হুরাইরা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমরা পরস্পরের প্রতি হিংসা পোষণ করো না, নকল ক্রেতা সেজে আসল ক্রেতার সামনে পণ্যের দাম বাড়িও না, ঘৃণা-বিদ্বেষ পোষণ করো না, পরস্পর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিও না, একজনের ক্রয়-বিক্রয়ের ওপর অন্যজন ক্রয়-বিক্রয় করো না। আল্লাহর বান্দাগণ! ‘তোমরা ভাই ভাই হয়ে থাকো। জেনে রাখো, মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে তাকে না জুলুম করতে পারে, না হীন জ্ঞান করতে পারে অথবা না পারে অপমান অপদস্ত করতে। তাকওয়া এখানেই থাকে। (এ কথাটা তিনি তিনবার বলেন এবং তিনি নিজের বুকের দিকে ইশারা করেন) কোন ব্যক্তির খারাপ প্রমাণিত হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলমান ভাইকে ঘৃণা করে কিংবা হীন জ্ঞান করে। বস্তুত প্রত্যেক মুসলমানের রক্ত (জীবন), ধন-মাল এবং মান-ইজ্জত অন্য মুসলমানের জন্য হারাম। (মুসলিম)


     ২৩৬. হযরত আনাস (রা)-এর বর্ণনা অনুসারে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদের কেউই ঈমানদার হতে পারে না যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্যে তা-ই পছন্দ করবে যা সে নিজের জন্য পছন্দ করে। (বুখারী ও মুসলিম)


     ২৩৭. হযরত আনাস (রা) বলেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনঃ তোমার ভাইকে সাহায্য করো, চাই সে নিষ্ঠুর জালিম হোক অথবা মজলুম। এক ব্যক্তি নিবেদন করলো, হে আল্লাহর রাসূল! লোকটা যদি মজলুম হয় আমি তাকে সাহায্য করবো এটা বুঝতে পারলাম; কিন্তু যদি সে জালিম হয় তাহলে আমি তাকে কিভাবে সাহায্য করবো? তিনি বললেনঃ তাকে জুলুম করা থেকে বিরত রাখ, বাঁধা দাও। এটাই তাকে সাহায্য করার অর্থ। (বুখারী)


    ২৩৮. হযরত আবু হুরাইরার (রা) বর্ণনা মতে, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ এক মুসলমানের ওপর অন্য মুসলমানের পাঁচটি অধিকার (হক) রয়েছে। সালামের জবাব দেয়া, রুগ্ন ব্যক্তির শশ্রূষা করা, জানাযার সাথে চলা, দাওয়াত কবুল করা এবং হাঁচির জবাব দেয়া (ইয়ারহামুকুল্লাহ বলা)।   (বুখারী ও মুসলিম)

      মুসলিমের অপর এক বর্ণনায় আছেঃ মুসলমানদের পরস্পরের ওপর ছয়টি অধিকার রয়েছে। তুমি যখন তার সাথে সাক্ষাত করবে তাকে সালাম করবে; তোমাকে যখন আমন্ত্রণ জানাবে তা গ্রহণ করবে, যখন তোমার কাছে উপদেশ (পরামর্শ) চাইবে, তাকে উপদেশ দেবে, হাঁচির সময় সে আলহামদুলিল্লাহ বললে, তুমি তার জবাবে ইয়ারহামুকাল্লাহ বলবে। যখন সে রুগ্ন হয়ে পড়বে, তাকে দেখতে যাবে এবং যখন সে মারা যাবে, তার জানাযায় শরীক হবে।


      ২৩৯. বারা’আ ইবনে আযেব্‌ বলেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে সাতটি কাজের নির্দেশ দিয়েছেন এবং সাতটি বিষয়ে নিষেধ করেছেন। সাতটি নির্দেশ হলো রোগীর খোঁজ-খবর নেয়া, জানাযার অনুসরণ করা, হাঁচির জবাব দেওয়া, শপথ বা প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করা, মজলুমের সাহায্য করা, কেউ দাওয়াত দিলে তা কবুল করা এবং সালামের বহুল প্রচলন করা। তাঁর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো হলো (পুরুষের জন্যে) স্বর্ণের আংটি পরিধান করা ও তৈরি করা, রূপার পাত্রে পান করা, লাল রংয়ের রেশমের গদীতে বসা, রেশম ও তুলার মিশ্রনে তৈরি কাপড় পরা, রেশমী বস্ত্র ব্যবহার করা, ‘কাচ্ছি’ ও ‘দিবাজ’ নামক রেশমী বস্ত্র পরিধান করা। (‘কাচ্ছি’ হলো রেশম ও তুলার মিশ্রণে তৈরি কাপড় আর ‘দিবাজ’ হলো এক প্রকার রেশমী বস্ত্র।) (বুখারী ও মুসলিম)

অপর এক বর্ণনায়, প্রথম সাতটির মধ্যে শপথ পূর্ণ করার স্থলে হারানো প্রাপ্তির ঘোষণা দেয়ার কথা রয়েছে।


Was this article helpful?

Related Articles

Leave A Comment?