পুণ্য কর্মের নির্দেশ ও মন্দ কর্ম হতে বিরত রাখার বিবরণ

মহান আল্লাহ বলেনঃ

‘তোমাদের মধ্যে এমন কিছু লোক অবশ্যই থাকতে হবে, যারা (মানুষকে) সর্বদা পূর্ণ ও কল্যাণের দিকে ডাকবে, ভাল ও সৎকাজের নির্দেশ দেবে এবং মন্দ ও পাপ কাজ থেকে বিরত রাখবে; যারা এরূপ কাজ করবে, তারাই হবে সফলকাম।’ (সূরা আলে-ইমরানঃ ১০৪)

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ

‘তোমরাই সর্বোত্তম জনগোষ্ঠী (উম্মাহ), তোমাদেরকে মানবজাতির পথনির্দেশনার জন্যে সৃষ্টি করা হয়েছে; তোমরা ন্যায় ও পূণ্যের  আদেশ করবে এবং অন্যায় ও পাপাচার থেকে বিরত রাখবে। (সূরা আলে-ইমরানঃ ১১০)

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ

‘(তোমরা) নম্রতা ও মার্জনার নীতি অবলম্বন করো, সৎকাজের নির্দেশ দাও এবং মূর্খদের সাথে তর্কে জড়িয়ো না। (সূরা আল-আরা’ফঃ ১৯৯)

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ

মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী পরস্পরের বন্ধু ও সঙ্গী। এরা পরস্পরকে ভালো কাজের নির্দেশ দেয়, সব অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে বিরত রাখে, নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত প্রদান করে এবং আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করে। (সূরা তওবাঃ ৭১)

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ

বনী ইসরাইলীদের মধ্য থেকে যারা কুফরীর পথ গ্রহণ করেছে, তাদের প্রতি দাউদ ও ঈসা বিন মরিয়মের ভাষায় লানত করা হয়েছে। কেননা তারা বিদ্রোহের পথ ধরেছিল এবং অত্যন্ত বাড়াবাড়ি শুরু করেছিল। তারা পরস্পরকে পাপাচার থেকে বিরত রাখার দায়িত্ব পরিহার করেছিল। অতীব জঘন্য কর্মনীতিই তারা গ্রহণ করেছিল। (সূরা মায়েদাঃ ৭৮-৭৯)

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ

সুতরাং হে নবী! যে জিনিসের নির্দেশ তোমাকে দেয়া হচ্ছে তা সজোরে ও উচ্চকণ্ঠে জানিয়ে দাও। এ ব্যাপারে মুশরিকদের কিছুমাত্র পরোয়া করো না। (সূরা আল হিজরঃ ৯৪)

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ

আমরা এমন লোকদের বাঁচিয়ে দিলাম যারা দুষ্কর্ম থেকে বিরত থাকত; আর যারা জালিম ছিল তাদেরকে পাকড়াও করলাম তাদের নাফরমানীর কাজের জন্যে কঠিন শাস্তি দিয়ে। (সূরা আল আরা’ফঃ ১৬৫)

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ

সুতরাং (হে নবী!) ‘লোকদের সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দাও, এ মহাসত্য তোমার প্রভুর (বব্ব-এর) নিকট থেকে এসেছে। এখন যার ইচ্ছা একে বিশ্বাস করুক আর যার ইচ্ছা অমান্য করুক। আমরা জালিমদের জন্যে দোযখের ব্যবস্থা করে রেখেছি।’ (সূরা আল-কাহাফঃ ২৯)

এ পর্যায়ের বিষযবস্তুর সাথে সঙ্গতিশীল বহু সংখ্যক আয়াত কুরআন মজীদে বিদ্যমান রয়েছে।

 

১৮৪. হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) বর্ণনা করেনঃ আমি রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তোমাদের কেউ যদি কোন পাপ কাজ সংঘটিত হতে দেখে, সে যেন তা হাত দিয়ে (শক্তি দ্বারা) বন্ধ করে দেয়। যদি সে এতে সমর্থ না হয়, তবে সে যেন মুখের (কথার) সাহায্যে (জনমত গঠন করে) তা বন্ধ করে দেয়। যদি সে এই শক্তিটুকুও না রাখে, তবে যেন অন্তরের সাহায্যে (সুপরিকল্পিতভাবে) তা বন্ধ করার চেষ্টা করে। (অর্থ্যাৎ কাজটির প্রতি ঘৃণা পোষণ করে)।   আর এটা হলো ঈমানের দুর্বলতম (বা নিম্নতম) স্তর; অর্থ্যাৎ এর নীচে ঈমানের আর কোন স্তর নেই। (মুসলিম)


১৮৫. হযরত ইবনে মাসউদ বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আমার পূর্বে যে নবীকেই কোন জাতির কাছে পাঠানো হয়েছে, তার সাহায্যের জন্য তার উম্মতের মধ্যে অবশ্যই একদল সহচর ও সাহায্যকারী থাকতো। তারা তার সুন্নাতকে কঠোরভাবে আঁকড়ে ধরতো এবং তাঁর নির্দেশাবলী মেনে চলতো, তাদের পর এমন কিছু লোকের আর্বিভাব হলো, তারা যা বলতো তা নিজেরাই মানতো না; বরং এমন কাজ করতো যা করার নির্দেশ তাদেরকে দেয়া হয়নি। অতএব, যে ব্যক্তি এ ধরনের লোকের বিরুদ্ধে হাত দিয়ে (শক্তি প্রয়োগের দ্বারা) জিহাদ করবে, সে মুমিন। যে ব্যক্তি এদের বিরুদ্ধে অন্তর দিয়ে জিহাদ করবে, সেও মুমিন। আর যে ব্যক্তি মুখ দিয়ে (মানুষকে বুঝানোর সাহায্যে) এদের বিরুদ্ধে জিহাদ করবে, সেও মুমিন। এরপর আর শর্ষের বীজ পরিমাণও ঈমান নেই। (মুসলিম)


১৮৬. হযরত আবুল ওয়ালীদ ‘উবাদা ইবনে সামিত (রা) বর্ণনা করেন, আমরা রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে মনোযোগের সাথে শ্রবণ করার, সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপাদে, স্বাভাবিক-অস্বাভাবিক সর্বাবস্থায় আনুগত্য করার এবং নিজেদের ওপর অন্যদেরকে অগ্রাধিকার দেয়ার শপথ (বাইয়াত) গ্রহণ করেছি। আমরা আরো শপথ নিয়েছি যে, যোগ্য ও উপযুক্ত শাসকের সাথে ক্ষমতার লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবো না। (রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ) তবে হ্যাঁ, তোমরা যদি তাকে স্পষ্টত ইসলাম বিরোধী কাজে জড়িত দেখ, যে বিষয়ে তোমাদের  কাছে আল্লাহ প্রদত্ত কোন দলিল প্রমাণ আছে (তবে তোমরা তার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে পারো)।  আমরা আরো শপথ নিয়েছি, আমরা যেখানেই থাকি না কেন, সর্বাবস্থায় সত্য ও ন্যায়ের (হকের) কথা বলবো। আর আল্লাহর (আনুগত্যের) ব্যাপারে কোন নিন্দুকের নিন্দা বা তিরস্কারের পরোয়া করবো না। (বুখারী ও মুসলিম)


১৮৭. হযরত নু’মান ইবনে বশীর বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহর নির্ধারিত সীমার মধ্যে বসবাসকারী ও সীমা অতিক্রমকারীর দৃষ্টান্ত হলোঃ একদল লোক লটারী করে জাহাজে উঠলো। তাদের কিছু সংখ্যক সঙ্গী নিজের তালায় এবং কিছু সংখ্যক উপরের  তলায় স্থান পেল। নীচ তলার লোকেরা পানির প্রয়োজন হলে ওপর তলার লোকদের পাশ দিয়ে পানি আনতে যায়। তারা (নীচ তলার লোকেরা) পরস্পর বললোঃ আমরা যদি আমাদের এখান দিয়ে একটা সুড়ঙ্গ করে দেই, তবে ওপর তলার লোকদেরকে কষ্ট দেয়া থেকে রেহাই দেয়া যেত। কিন্তু এখন যদি তারা (ওপর তলার লোকেরা) তাদেরকে এ কাজ করতে অনুমতি দেয়, তবে সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে। আর যদি তারা তাদেরকে এই কাজ করতে বাধা দেয় (অর্থ্যাৎ ছিদ্র করা থেকে বিরত রাখে), তাহলে নিজেরাও বাঁচবে এবং অন্যদেরকেও বাঁচাতে পারবে। (বুখারী)


১৮৮. হযরত উম্মে সালমা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তোমাদের ওপর কিছু সংখ্যক লোককে শাসক নিযুক্ত করা হবে। তোমরা তাদের কিছু কর্মকাণ্ডের সাথে (ইসলামী শরীয়াহ মুতাবেক হওয়ার কারণে) পরিচিত হবে আর কিছু কর্মকাণ্ড তোমাদের কাছে (ইসলামী শরীয়াহ বিরোধী হওয়ার কারণে) অপরিচিত মনে হবে। এহেন অবস্থায় যে ব্যক্তি এগুলোকে খারাপ জানবে সে (গুনাহ্‌ থেকে) দায়মুক্ত হবে। আর যে ব্যক্তি এর প্রতিবাদ করবে সে (জবাবদিহির ব্যাপারে) নিরাপদ থাকবে। কিন্তু যে ব্যক্তি এহেন কাজের প্রতি সন্তোষ প্রকাশ করল এবং এর সাথে সহযোগিতা করল, (সে নাফরমানি করল)।   সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি তাদের (স্বৈর শাসকদের) বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করবো না? তিনি বললেনঃ না, যতক্ষণ তারা নামায কায়েম  করে। (মুসলিম)


১৮৯. হযরত যয়নাব বিনতে জাহাশ (রা) বর্ণনা করেন, একদা রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে তাঁর কাছে এলেন। তিনি বলছিলেনঃ লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহু, ধ্বংস আরবের সেই খারাবি ও অনিষ্টের কারণে, যা নিকটে এসে পড়েছে। আজ ইয়াজুজ-মাজুজের (বন্দীশালার) দরজা এতটা খুলে দেওয়া হয়েছে। (এই বলে) তিনি তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলী ও তর্জনী দিয়ে একটা বৃত্ত বানিয়ে লোকদের দেখালেন। আমি আরজ করলামঃ ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে নেককার (খোদাভীরু) লোক উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও কি আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো?’ তিনি বললেনঃ ‘হ্যাঁ, যখন অশ্লীল ও নোংরা কাজের অত্যাধিক বিস্তার ঘটবে। (বূখারী ও মুসলিম)


১৯০. হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ ‘তোমরা রাস্তার ওপর বসা থেকে বিরত থাকো।’ সাহাবীগণ বললেনঃ ‘হে আল্লাহর রাসূল! রাস্তার ওপর বসা ছাড়া তো আমাদের উপায় নেই।  আমরা সেখানে বসে (পারস্পারিক প্রয়োজনে) কথাবার্তা বলে থাকি।’ রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ‘তোমরা রাস্তায় বসা থেকে বিরত থাকতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছো; তাহলে রাস্তার হক আদায় করো।’ তারা  বললেনঃ ‘হে আল্লাহর রাসূল! ‘রাস্তার হক আবার কি?’ তিনি বললেনঃ ‘রাস্তার হক হলো— দৃষ্টি সংযত রাখা (রাস্তা থেকে) কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা, (লোকদের) সালামের জবাব দেয়া, (তাদেরকে) ভালো কাজের নির্দেশ দেয়া এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখা। (বুখারী ও মুসলিম)


১৯১. হযরত ইবনে আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, একদা রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জনৈক ব্যক্তির হাতে একটি সোনার আংটি দেখতে পেলেন। তিনি লোকটির হাত খেকে আংটিটি খুলে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন; তারপর বললেনঃ তোমাদের কেউ কি নিজ হাতে জ্বলন্ত অঙ্গার রাখতে পছন্দ করবে? রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (সেখান থেকে চলে যাওয়ার পর লোকটিকে বলা হলো আংটিটি তুলে নিয়ে অন্য কোন ভালো কাজে ব্যবহার করো। সে বললো, আল্লাহর কসম! যে বস্তুকে খোদ রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছেন, আমি তা কখনো হাতে তুলে নেবো না। (মুসলিম)


১৯২. হযরত আবু সাঈদ হাসান আল-বসরী (রা) বর্ণনা করেন, একদা হযরত আয়েয ইবনে আমর (রা) ওবায়দুল্লাহ ইবনে যিয়াদের কাছে গেলেন। তিনি (আয়েয) বললেনঃ ‘হে  বৎস! আমি রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে  বলতে শুনেছিঃ নিকৃষ্ট রাখাল (শাসক) হলো সেই ব্যক্তি, যে তত্ত্বাবধানের ব্যাপারে নম্রতা ও সহনশীলতা অবলম্বন করে না। তুমি সাবধান থাকো, যেন এর মধ্যে শামিল না হও।’ তাঁকে (ধমকের সূরে) বলা হলো, থামো! কেননা, তুমি তো মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের মধ্যকার অপদার্থদের অন্তর্ভুক্ত। তিনি (আয়েয) বললেনঃ তাঁদের (সাহাবীদের) মধ্যে কি এরূপ নিকৃষ্ট অপদার্থ লোক ছিল? নিকৃষ্ট ও অপদার্থ লোক তো তাদের পরবর্তী স্তরে কিংবা তারা ছাড়া অন্য কোন জনগোষ্ঠী। (মুসলিম)


১৯৩. হযরত হুযাইফা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে সত্তার হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ! তোমরা অবশ্যই ন্যায় ও সত্যের আদেশ দেবে এবং অন্যায় ও অসত্যের প্রতিরোধ করবে। নচেত, অচিরেই আল্লাহ তোমদের শাস্তি দেবেন। তখন (গযবে নিপতিত হয়ে) তোমরা দো’আ করবে— আল্লাহকে ডাকবে; কিন্তু তখন তোমাদের ডাকে  সাড়া দেয়া হবে না (অর্থ্যাৎ দো’আ কবুল করা হবে না)।   ইমাম তিরমিযী বলেনঃ এটি হাসান হাদীস।


১৯৪. হযরত আবু সাঈদ আল খুদরী বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ জালিম ও স্বৈরাচারী শাসকের সামনে ন্যায় ও ইনসাফের কথা বলাই উত্তম জিহাদ। (আবু দাউদ ও তিরমিযী)


১৯৫. হযরত আবু আবদুল্লাহ তারেক বিন শিহাব (রা) বর্ণনা করেন, একদা রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সওয়ারীর পাদানিতে (রেকাবে) পা রাখছিলেন ঠিক এমন সময় এক ব্যক্তি তাঁর কাছে প্রশ্ন করলোঃ ‘সর্বোত্তম জিহাদ কোনটি?’ তিনি বললেনঃ ‘জালিম স্বৈরাচারী শাসকের সামনে হক কথা বলা’ (সর্বোত্তম জিহাদ)।


১৯৬. হযরত ইবনে মাসউদ (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ বনী ঈসরাইলীদের মধ্যে সর্বপ্রথম এভাবে দুস্কুতি ও অনাচার প্রবেশ লাভ করে— এক (আলেম) ব্যক্তি অপর ব্যক্তির সাথে মিলিত হতো এবং তাকে বলত, হে অমুক! আল্লাহকে ভয় করো এবং যা করছো তা পরিহার করো; কেননা এ কাজ তোমার জন্য বৈধ নয়। পরদিনও সে তার সঙ্গে মিলিত হয়ে তাকে পূর্বাবস্থায় দেখতে পেত; কিন্তু সে আর তাকে বারণ করত না। কেননা ইতোমধ্যে সে তার খানাপিনা ও ওঠা-বসায় শরীক হয়ে এমন অবস্থায় উপনীত হলো যে, আল্লাহ তাদের একের অন্তরের কালিমা দ্বারা অন্যের অন্তরকে কলুষিত করে দিলেন। তারপর তিনি এ আয়াত পাঠ করলেনঃ

    ‘বনী ইসরাঈলীদের মধ্যে যারা কুফরীর পথ অবলম্বন করেছিল, তাদের প্রতি দাউদ ও ঈসা ইবনে মরিয়মের মুখ দিয়ে অভিসম্পাত করানো হলো। কেননা, তারা বিদ্রোহীর পথ ধরেছিল এবং অত্যন্ত বাড়াবাড়ি শুরু করেছিল। তারা পরস্পরকে পাপ কাজ থেকে বিরত রাখার দায়িত্ব পরিহার করেছিল। এভাবে খুব জঘন্য কর্মনীতিই তারা অবলম্বন করেছিল। আজকে তোমরা এমন অনেক লোককে দেখতে পাচ্ছ, যারা (মুমিনদের প্রতিকূলে) কাফিরদের সাথে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা করতে তৎপর। নিঃসন্দেহে অনেক খারাপ পরিণাম তাদের জন্যে অপেক্ষা করছে, যার ব্যবস্থা‌ তার প্রবৃত্তিগুলোই তাদের জন্য করেছে। আল্লাহ তাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন, যার পরিণামে তারা চিরস্থায়ী শাস্তির মধ্যে নিমজ্জিত থাকবে। তারা যদি যথার্থই আল্লাহ, রাসূল এবং রাসূলদের প্রতি অবতীর্ণ কিতাবের প্রতি ঈমান রাখতো, তবে তারা কখনই (ঈমানদার লোকদের বিরুদ্ধে) কাফিরদেরকে নিজেদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করতো না। কিন্তু তাদের অধিকাংশ লোকই ছিল ফাসিক।’ (সূরা আল মায়িদাঃ ৭৮-৮১)

এরপর মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কখখনো নয়, আল্লাহর কসম! তোমরা অবশ্যই নেককাজের আদেশ করতে থাকবে এবং অন্যায় ও গর্হিত কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখবে, জালিমের হাত শক্ত করে ধরবে এবং তাকে সত্যের দিকে ফিরিয়ে আনবে ও ন্যায় সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত করবে। অন্যথায়, আল্লাহ তোমাদের (পুণ্যবান ও পাপাচারী নির্বিশেষে) পরস্পরের অন্তরকে একাকার করে দেবেন। অতঃপর বনী ঈসরাইলীদের মতো তোমাদের ওপরও লা’নত বর্ষণ করবেন। (আবু দাউদ ও তিরমিযী)

ইমান তিরমিযী বলেছেন, এটি হাসান হাদীস। তবে হাদীসের শব্দগুলো আবু দাউদের।

ইমাম তিরমিযী বর্ণিত হাদীসটির অর্থ নিম্নরূপঃ রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, বনী ইসরাঈলীরা ব্যাপকভাবে পাপাচারে জড়িয়ে পড়লে তাদের আলেমগণ তাদেরকে তা থেকে বিরত থাকতে বললো। কিন্তু তারা বিরত থাকল না। তৎসত্ত্বেও আলেমগণ তাদের সাথে ওঠা-বসা ও পানাহার করতে থাকলেন। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাদের অন্তরকে পরস্পরের সাথে মিলিয়ে দিলেন। (পরিণামে আলেমরাও পাপ কাজে জড়িয়ে পড়ল)।  আল্লাহ তোমাদের দাঊদ ও ঈসা ইবনে মরিয়মের জবানীতে অভিশাপ দিলেন। কেননা তারা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল এবং অত্যন্ত বাড়াবাড়ি আরম্ভ করে দিয়েছিল। (একথা বলার পর) রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হেলান দেয়া অবস্থা থেকে সোজা হয়ে বসলেন এবং বললেনঃ কখখনো নয়, যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ! তোমরা তাদেরকে (জালিমদেরকে) হাত ধরে টেনে এনে সত্যের (হকের) ওপর প্রতিষ্ঠিত না করা পর্যন্ত বিরত থাকবে না।


১৯৭. হযরত আবু বকর সিদ্দিক বলেনঃ হে লোকসকল! তোমরা তো এ আয়াত পাঠ করে থাকোঃ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের কথা চিন্তা করো, অপর কারো পথভ্রষ্ট হওয়ায় তোমরা কোনরূপ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, যদি তোমরা সঠিক পথে অবিচল থাক। তোমাদের সবাইকে আল্লাহর কাছে ফিরে যেতে হবে। তারপর তিনি তোমাদের বলে দেবেন, তোমরা (পৃথিবীতে) কি করেছিলে।’ (সূরা আল-মায়েদাঃ ১০৫) আমি (আবু বকর) রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ লোকেরা দেখবে যে, জালিম জুলুম করছে, কিন্তু তারা তার প্রতিরোধ করছে না, এরূপ লোকদের ওপর আল্লাহ শীগ্‌গীরই শাস্তি পাঠাবেন। (আবু দাউদ, তিরমিযী ও নাসাঈ)


 

Was this article helpful?

Related Articles

Leave A Comment?