জামা, আস্তীন, লুঙ্গী ও পাগড়ীর দৈর্ঘত্ব সংক্রান্ত বর্ণনা

কুর্তা ও তার আস্তিন কিরূপ হতে হবে কুর্তা ও আস্তিনের পরিমাণ, লুঙ্গি ও পাগড়ীর সীমা এবং অহংকারবশতঃ কাপড় ঝুলিয়ে দেয়া হারাম এছাড়া তা মাকরূহ হওয়ার বর্ণনা

৭৯০. আসমা বিনতে ইয়াযীদ আনসারীরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর জামার আস্তিন ছিল হাতের কব্জি পর্যন্ত।

ইমাম আবু দাঊদ ও ইমাম তিরমিযী হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন। ইমাম তিরমিযী বলেছেন, হাদীসটি হাসান।


৭৯১. ইবনে উমার (রা) থেকে বর্ণিত। নবী (সা) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি অহংকারবশে তার কাপড় (গোছার নিচে) ঝুলিয়ে দেয়, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার প্রতি তাকাবেন না। আবু বকর (রা) বলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমার তহবন্দ তো প্রায়ই ঝুলে যায়, যদি না আমি সচেতন থাকি। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে বলেনঃ তুমি তাদের মধ্যে শামিল নও, যারা অহংকার বশে কাপড় ঝুলিয়ে থাকে।

ইমাম বুখারী হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন এবং মুসলিম এর অংশবিশেষ বর্ণনা করেছেন।


৭৯২. আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। নবী (সা) বলেনঃ আল্লাহ কিয়ামতের দিন সেই ব্যক্তির দিকে তাকাবেন না যে অহংকার বশে তার তহবন্দ বা পাজামা (গোছার নিচে) ঝুলিয়ে দেয়। (বুখারী)


৭৯৩. আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। নবী (সা) বলেছেনঃ দুই পায়ের টাখনুর নীচে তহবন্দ যে পরিমাণ স্থান ঢেকে রাখবে তা জাহান্নামে যাবে। (বুখারী)


৭৯৪. হযরত আবু যার (রা) থেকে বর্ণিত। নবী (সা) বলেছেনঃ তিনজন লোকের সাথে আল্লাহ কিয়ামতের দিন কথা বলবেন না, তাদের প্রতি তাকাবেন না এবং তাদের (গুনাহ থেকে) পবিত্র করবেন না। উপরন্তু তাদের জন্য রয়েছে মর্মন্তুদ শাস্তি। রাসূলুল্লাহ (সা) কথাগুলো তিন তিনবার বলেন। আবু যার (রা) বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! এসব বিফল মনোরথ ও ক্ষতিগ্রস্ত লোক কারা? তিনি বলেনঃ (১) যে ব্যক্তি অহংকারবশে কাপড় (গোছার নিচে) ঝুলিয়ে দেয়, (২) যে ব্যক্তি উপকার করে খোঁটা দেয় বা বলে বেড়ায় এবং (৩) যে ব্যক্তি মিথ্যা শপথ করে তার পণ্য বিক্রয় করে।

ইমাম মুসলিম হাদীসটি রিয়ায়াত করেছেন। তাঁর আরেক বর্ণনায় রয়েছেঃ যে ব্যক্তি তার লুঙ্গি হেঁচড়িয়ে চলে।


৭৯৫. ইবনে উমার (রা) থেকে বর্ণিত। নবী (সা) বলেছেনঃ তহবন্দ বা পাজামা, জামা ও পাগড়ীই ঝুলিয়ে দেয়া হয়। যে ব্যক্তি অহংকার বশে এরূপ কিছু ঝুলিয়ে দিবে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ তার প্রতি তাকাবেন না।

ইমাম আবু দাঊদ ও ইমাম নাসাঈ সহীহ সনদে হাদীসটি রিয়ায়াত করেছেন।


৭৯৬. আবু জুরাই জাবির ইবনে সুলাইম (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একজনকে দেখলাম, লোকেরা তার মতামতের অনুসরণ করছে। তিনি যাই বলেন, লোকজন তাই গ্রহণ করছে। আমি বললাম, ইনি কে? লোকেরা বলল, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আমি বললাম, আলাইকাস্‌ সালাম ইয়া রাসূলুল্লাহ! এভাবে দু’বার বললাম। তিনি বলেনঃ আলাইকাস্‌ সালাম বলো না। কারণ আলাইকাস সালাম হল মৃতের সালাম, বরং বলঃ আস্‌সালামু আলাইকা। আমি বললাম, আপনি কি আল্লাহর রাসূল? তিনি বলেনঃ (হাঁ) আমি সেই আল্লাহর রাসূল, তুমি কোন বিপদ-মুসিবতে পড়ে যাঁর নিকট দোয়া করো এবং যিনি তা দূর করেন, তুমি দুর্ভিক্ষে পড়ে যার নিকট দো’আ করো এবং যিনি তোমার জন্য শস্য উৎপন্ন করেন, তুমি জন মানবহীন অথবা পানিবিহীন প্রন্তরে তোমার সওয়ারী হারিয়ে যার নিকট দো’আ কর এবং যিনি তোমাকে তা ফিরিয়ে দেন। জাবির ইবনে সুলাইম বলেন, আমি বললাম, আমাকে উপদেশ দিন। তিনি বলেনঃ কাউকে কখনো গালি-গালাজ করো না। জাবির বলেন, এরপর আমি কখনো আযাদ, গোলাম, উট, বকরীকেও গালি দিইনি। ভালো ও নেকীর কোন কাজকে তুচ্ছ জ্ঞান করো না। তোমার ভাইয়ের সাথে হাসিমুখে কথা বলবে। এটিও একটি নেকীর কাজ। ইযার বা তহবন্দ তোমার হাঁটুর নীচে অর্ধেক পর্যন্ত তুলে রাখবে। এতদূর যদি উঠাতে তোমার বাধা থাকে তাহলে অন্তত টাখনু পর্যন্ত তুলে রাখবে। লুঙ্গি ঝুলিয়ে দেয়া থেকে দূরে থাকবে। কারণ এটা হচ্ছে অহংকারের অন্তর্গত। আর আল্লাহ অহংকার পছন্দ করেন না। কেউ যদি তোমাকে গালি দেয় অথবা তোমার সম্পর্কে সে যা জানে সে বিষয়ে তোমার দুর্নাম করে, তুমি তার সম্পর্কে যা জান, সে বিষয়ে তার দুর্নাম করো না। কারণ এর খারাপ পরিণাম তারই উপর বর্তাবে।

ইমাম আবু দাঊদ ও ইমাম তিরমিযী সহীহ সনদে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম তিরমিযী বলেছেন, হাদীসটি হাসান ও সহীহ।


৭৯৭. আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা এক ব্যক্তি (টাখনুর নীচে) তহবন্দ ঝুলিয়ে নামায পড়ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে বলেন, যাও, আবার উযু করো। সে গিয়ে পুনরায় উযু করে এল। তিনি আবার বললেন, যাও, আবার উযু কর। সে গেল এবং পুনরায় উযু করে এল। একজন বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি কেন তাকে উযু করার নির্দেশ দিচ্ছেন, তারপর নীরবতা অবলম্বন করছেন? তিনি বলেনঃ এ ব্যক্তি তার তহবন্দ (টাখনুর নীচে) ঝুলিয়ে নামায পড়ছিল। অথচ আল্লাহ এমন লোকের নামায কবুল করেন না, যে তার তহবন্দ ঝুলিয়ে দিয়ে নামায পড়ে।

ইমাম আবু দাঊদ ইমাম মুসলিমের শর্তে আ হাদীস সহীহ সনদে রিয়ায়াত করছেন।


৭৯৮. কায়েস ইবনে বিশর আত-তাগলিবী (র) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমাকে আমার পিতা অবহিত করেন যে, তিনি ছিলেন আবু দারদা (রা)-এর সাথী। তিনি (বিশর) বলেন, দামেশকে নবী (সা)-এর একজন সাহাবী ছিলেন। তাঁকে সাহল ইবনে হানযালিয়্যা বলা হত। তিনি নির্জনতা বেশি পছন্দ করতেন, লোকদের সাথে মেলামেশা খুবই কম করতেন, নামাযেই অধিকাংশ সময় কাটিয়ে দিতেন, নামায থেকে অবসর হয়ে তাসবীহ ও তাকবীরে মশগুল থাকতেন তাঁর পরিবার-পরিজনের নিকট ফিরে আসার পূর্ব পর্যন্ত। (একদা) তিনি আমাদের নিকট দিয়ে গেলেন। আমরা তখন আবু দারদা (রা)-এর নিকট ছিলাম। আবু দারদা (রা) তাঁকে বলেন, এমন কোন কথা আমাদের বলে দিন, যা আমাদের উপকারে আসবে অথচ আপনারও কোন ক্ষতি হবে না। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) একটি ক্ষুদ্র বাহিনী পাঠালেন। বাহিনী ফিরে আসার পর তাদের একজন এসে ঐ মজলিসে বসল যেখানে রাসূলুল্লাহ (সা)ও বসে ছিলেন। আগত লোকটি তাঁর পাশে বসা লোকটিকে বলল, যদি তুমি আমাদের তখন দেখতে পেতে যখন জিহাদের ময়দানে শত্রুর মুখোমুখি হয়েছিলাম, অমুক (কাফের) বর্শা উঠিয়ে আক্রমণ করলো এবং খোঁটা দিলো। জবাবে (আক্রান্ত মুসলমানটি) বলল, এই নে আমর পক্ষ থেকে, আর আমি হচ্ছি গিফার গোত্রের যুবক। তার এই বক্তব্য সম্পর্কে আপনি কি বলেন? লোকটি বলল, আমার মতে (অহংকারের কারণে) তার সওয়াব নষ্ট হয়ে গেছে। অন্যজন একথা শুনে বলল, আমি তো এতে কোন দোষ দেখি না। তারা বিতর্কে লিপ্ত হল, এমনকি রাসূলুল্লাহ (সা) তা শুনে ফেলেন। তিনি বলেনঃ সুবহানাল্লাহ এতে কোন দোষ নেই, সে (আখিরাতে) পুরস্কৃত হবে এবং (দুনিয়ায়) প্রশংসিত হবে। কায়েস ইবনে বিশর বলেন, আমি আবু দারদা (রা) কে দেখলাম, তিনি এত খুশি হয়েছেন এবং তাঁর দিকে নিজের মাথা তুলে বলেন, আপনি কি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে একথা শুনেছেন? ইবনে হানযালিয়্যা (রা) বলেন, হ্যাঁ, শুনেছি। আবু দারদা (রা) বারবার একথাটি ইবনে হানযালিয়্যার সামনে বলতে লাগলেন। আমি শেষে বলেই ফেললাম, আপনি কি হানযালিয়্যার হাঁটুর উপর চরে বসতে চান?

বিশর (র) বলেন, অন্য একদিন ইবনে হানযালিয়্যা (রা) আবার আমাদের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। আবু দারদা (রা) তাঁকে বলেন, এমন কিছু কথা বলুন, যা আমাদের কাজে লাগে এবং আপনারও ক্ষতি না হয়। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) আমাদের বলেছেনঃ যে ব্যক্তি তার ঘোড়ার খাবারের জন্য অর্থ ব্যয় করে সে এমন এক ব্যক্তির ন্যায় যে সদাকা দেয়ার জন্য নিজের হাত বাড়িয়ে দেয় এবং তা আর টেনে নেয় না। তারপর আর একদিন ইবনে হানযালিয়্যা (রা) আমাদের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। আবু দারদা (রা) তাঁকে বলেন, এমন কিছু কথা আমাদের বলূন, যাতে আমরা লাভবান হই এবং আপনার ক্ষতি না হয়। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ খুরাইম আল-উসাইদী কী চমৎকার ব্যক্তি যদি তার চুল বেশি লম্বা না হত এবং তার ইযার টাখনুর নীচে না পড়ত। কথাটি খুরাইমের কানে পৌঁছে গেলো। তিনি দ্রুত ছুরি নিয়ে নিজের চুল কান পর্যন্ত কেটে ফেললেন এবং নিজের ইযারটি হাঁটু ও টাখনুর মাঝখানে অধাংশ পর্যন্ত উঠিয়ে নিলেন। তারপর আর একদিন ইবনে হানযালিয়্যা (রা) আমাদের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন। আবু দারদা (রা) তাঁকে বলেন, এমন কিছু কথা আমাদের শুনান যাতে আমাদের লাভ হয় এবং আপনার কোন ক্ষতি না হয়। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছিঃ তোমরা নিজেদের ভাইদের কাছে যাচ্ছ। কাজেই তোমরা নিজেদের হাওদাগুলো ঠিক করে নাও এবং নিজেদের পোশাকগুলোও ঠিক করে নাও, এমনকি তোমরা লোকদের মধ্যে সর্বোত্তম পোশাকধারী ও সর্বোত্তম চেহারার অধিকারী হয়ে যাও। কারণ আল্লাহ অশ্লীলতার ধারক ও নিঃসঙ্কোচে অশ্লীল কার্য সম্পাদনকারীকে ভালোবাসেন না।

ইমাম আবু দাঊদ উত্তম সনদে হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন। তবে কায়েস ইবনে বিশরের হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে শক্তিমত্তা ও দুর্বলতার ব্যাপারে মতবিরোধ আছে। ইমাম মুসলিমও তার থেকে হাদীস রিয়ায়াত করেছেন।


৭৯৯. আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ মুসলিমের লুঙ্গি বা পাজামা হাঁটু ও পায়ের গোছার মাঝামাঝি স্থান পর্যন্ত লম্বা হবে। অবশ্য টাখনু গিরা ও পায়ের গোছার মাঝামাঝি থাকাও দোষের নয়। টাখনু গিরার নিচে যেটুকু থাকবে, তা জাহান্নামে যাবে। যে লোক অহংকারের বশবর্তী হয়ে লুঙ্গি বা পাজামা নিচের দিকে ঝুলিয়ে দেয়, (কিয়ামাতের দিন) আল্লাহ তার প্রতি ফিরেও তাকাবেন না। (আবু দাঊদ)


৮০০. ইবনে উমর (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলূল্লাহ (সা)-এর নিকট দিয়ে গেলাম। আমার তহবন্দ তখন (গোছার) নীচে ঝুলন্ত ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ হে আবদুল্লাহ! তোমার তহবন্দ উপরে উঠাও। আমি তা উপরে উঠালাম। তিনি আবার বলেনঃ আরো উঠাও। আমি তা আরো উঠালাম। এভাবে তাঁর নির্দেশক্রমে আমি তা উঠাতেই থাকলাম। লোকদের একজন বলল, তা কতদূর উঠাতে হবে? তিনি বলেনঃ দু’পায়ের গোছার মাঝামাঝি পর্যন্ত। (মুসলিম)


৮০১. ইবনে উমার (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেনঃ রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি অহংকারবশে তার কাপড় (টাখনুর নিচে) ঝুলিয়ে চলবে, কিয়ামাতের দিন আল্লাহ তার প্রতি ফিরেও তাকাবেন না। উম্মু সালামা (রা) বলেন, তাহলে মহিলারা তাদের আঁচলের ব্যাপারে কি করবে? তিনি বলেনঃ তারা (গোছা থেকে) এক বিঘত পরিমাণ উপরে রাখবে। উম্মে সালামা (রা) বলেন, এতে তো তাদের পা উন্মুক্ত হয়ে পড়বে। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ তাহলে তারা এক হাত পরিমাণ নিচে পর্যন্ত ঝুলাতে পারে, এর চাইতে যেন বেশি না ঝুলায়।

ইমাম আবু দাঊদ ও ইমাম তিরমিযী তিরমিযী এ হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন। ইমাম তিরমিযী বলেছেন, হাদীসটি হাসান ও সহীহ।


 

Was this article helpful?

Related Articles

Leave A Comment?