জান্নাতে প্রবেশকারী সর্বশেষ জান্নাতী

৫৪. আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

“আমি অবশ্যই চিনি জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভকারী সর্বশেষ জাহান্নামী ও জান্নাতে প্রবেশকারী সর্বশেষ জান্নাতীকে: জনৈক ব্যক্তি হামাগুড়ি দিয়ে জাহান্নাম থেকে বের হবে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে বলবেন: যাও জান্নাতে প্রবেশ কর, সে জান্নাতে আসবে, তাকে ধারণা দেওয়া হবে জান্নাত পূর্ণ। সে ফিরে এসে বলবে: হে আমার রব আমি তা পূর্ণ পেয়েছি, অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাকে বলবেন: যাও জান্নাতে প্রবেশ কর। তিনি বলেন: সে জান্নাতে আসবে তাকে ধারণা দেওয়া হবে জান্নাত পূর্ণ। সে ফিরে এসে বলবে: হে আমার রব, আমি তা পূর্ণ পেয়েছি। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলবেন: যাও জান্নাতে প্রবেশ কর, তোমার জন্য দুনিয়ার সমান ও তার দশগুণ জান্নাত রয়েছে, (অথবা তোমার জন্য দুনিয়ার দশগুণ জান্নাত রয়েছে), তিনি বলেন: সে বলবে: হে আমার রব আপনি আমার সাথে মশকরা করছেন অথবা আমাকে নিয়ে হাসছেন অথচ আপনি বাদশাহ?” তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি হাসতে, তার মাড়ির দাঁত পর্যন্ত বের হয়েছিল। তিনি বলেন: তখন বলা হত: এ হচ্ছে মর্যাদার বিবেচনায় সবচেয়ে নিম্ন জান্নাত”। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম) হাদীসটি সহীহ।


৫৫. ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

“সর্বশেষ জান্নাতে প্রবেশ করবে এমন ব্যক্তি, যে একবার চলবে একবার হোঁচট খাবে, একবার আগুন তাকে ঝলসে দিবে, যখন সে তা অতিক্রম করবে তার দিকে ফিরে তাকাবে, অতঃপর বলবে: বরকতময় সে সত্তা যিনি আমাকে তোমার থেকে নাজাত দিয়েছেন। নিশ্চয় আল্লাহ আমাকে এমন বস্তু দান করেছেন যা পূর্বাপর কাউকে দান করেন নি। অতঃপর তার জন্য একটি গাছ জাহির করা হবে, সে বলবে: হে আমার রব আমাকে এ গাছের নিকটবর্তী করুন, যেন তার ছায়া গ্রহণ করতে পারি ও তার পানি পান করতে পারি। আল্লাহ তা‘আলা বলবেন: হে আদম সন্তান যদি আমি তোমাকে এটা দান করি হয়তো (আবারও) অন্য কিছু তলব করবে। সে বলবে: না, হে আমার রব, তাকে ওয়াদা দিবে যে এ ছাড়া কিছু তলব করবে না, তার রব তাকে ছাড় দিবেন, কারণ সে দেখবে যার ওপর তার ধৈর্য সম্ভব হবে না। তাকে তার নিকটবর্তী করবেন, ফলে সে তার ছায়া গ্রহণ করবে ও তার পানি পান করবে। অতঃপর তার জন্য অপর গাছ জাহির করা হবে, যা পূর্বের তুলনায় অধিক সুন্দর। সে বলবে: হে আমার রব, আমাকে এর নিকটবর্তী করুন, যেন তার পানি পান করতে পারি ও তার ছায়া গ্রহণ করতে পারি, এ ছাড়া কিছু চাইব না। তিনি বলবেন: হে বনি আদম তুমি কি আমাকে ওয়াদা দাওনি অন্য কিছু চাইবে না? তিনি বলবেন: আমি যদি তোমাকে এর নিকটবর্তী করি হয়তো (আবারও) অন্য কিছু চাইবে, ফলে সে তাকে ওয়াদা দিবে যে, অন্য কিছু চাইবে না, তার রব তাকে ছাড় দিবেন, কারণ সে দেখবে যার ওপর তার ধৈর্য নেই। অতঃপর তাকে তার নিকটবর্তী করবেন, সে তার ছায়া গ্রহণ করবে ও তার পানি পান করবে। অতঃপর তার সামনে জাহির করা হবে একটি গাছ জান্নাতের দরজার মুখে, যা পূর্বের দু’টি গাছ থেকে অধিক সুন্দর। সে বলবে: হে আমার রব, আমাকে এ গাছের নিকটবর্তী করুন আমি তার ছায়া গ্রহণ করব ও তার পানি পান করব, এ ছাড়া কিছু চাইব না। তিনি বলবেন: হে বনি আদম তুমি কি আমাকে ওয়াদা দাওনি অন্য কিছু চাইবে না? সে বলবে: অবশ্যই হে আমার রব, এটাই আর কিছু চাইব না, তার রব তাকে ছাড় দিবেন, কারণ সে দেখবে যার ওপর তার ধৈর্য নেই। অতঃপর তিনি তাকে তার নিকটবর্তী করবেন, যখন তার নিকটবর্তী করা হবে সে জান্নাতীদের আওয়াজ শুনবে, সে বলবে: হে আমার রব, আমাকে তাতে প্রবেশ করান, তিনি বলবেন: হে বনি আদম, কিসে তোমার থেকে আমাকে নিষ্কৃতি দিবে? তুমি কি সন্তুষ্ট যে আমি তোমাকে দুনিয়া ও তার সাথে তার সমান দান করি? সে বলবে: হে আমার রব আপনি কি আমার সাথে ঠাট্টা করছেন অথচ আপনি দু’জাহানের রব? ইবন মাসউদ হেসে দিলেন, তিনি বললেন: তোমরা আমাকে কেন জিজ্ঞাসা করছ না আমি কেন হাসছি? তারা বলল: কেন হাসছেন? তিনি বললেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ হেসেছেন। তারা (সাহাবীগণ) বলল: হে আল্লাহর রাসূল কেন হাসছেন? তিনি বললেন: আল্লাহর হাসি থেকে যখন সে বলল: আপনি আমার সাথে ঠাট্টা করছেন অথচ আপনি দু’ জাহানের রব? তিনি বললেন: আমি তোমার সাথে ঠাট্টা করছি না, তবে আমি যা চাই করতে পারি”। (সহীহ মুসলিম) হাদীসটি সহীহ।


৫৬. আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,

“লোকেরা বলল: হে আল্লাহর রাসূল কিয়ামতের দিন আমরা কি আমাদের রবকে দেখব? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: “চৌদ্দ তারিখের রাতে চাঁদ দেখায় তোমরা কি সন্দেহ (বা মতবিরোধ) কর?” তারা বলল: না, হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন: “তোমরা আল্লাহকে সেভাবে (স্পষ্ট) দেখবে। কিয়ামতের দিন আল্লাহ সকল মানুষকে জমা করে বলবেন: যে যে বস্তুর ইবাদত করত সে যেন তার পিছু নেয়, ফলে যে সূর্যের ইবাদত করত সে সূর্যের অনুগামী হবে। যে চাঁদের ইবাদত করত সে চাঁদের অনুগামী হবে। যে তাগুতের ইবাদত করত সে তাগুতের অনুগামী হবে। শুধু এ উম্মত অবশিষ্ট থাকবে, তাতে থাকবে তার সুপারিশকারীগণ অথবা তার মুনাফিকরা, বর্ণনাকারী ইবরাহীম সন্দেহ পোষণ করেছেন , অতঃপর তাদের নিকট আল্লাহ এসে বলবেন: আমি তোমাদের রব, তারা বলবে: আমরা এখানে অবস্থান করছি যতক্ষণ না আমাদের রব আমাদের নিকট আসেন, যখন আমাদের রব আসবেন আমরা তাকে চিনব, ফলে আল্লাহ সে রূপে তাদের নিকট আসবেন যে রূপে তারা তাকে চিনে। অতঃপর তিনি বলবেন: আমি তোমাদের রব, তারা বলবে: আপনি আমাদের রব, অতঃপর তারা তার অনুগামী হবে। আর জাহান্নামের পৃষ্ঠদেশে পুলসিরাত কায়েম করা হবে, আমি এবং আমার উম্মত সর্বপ্রথম তা অতিক্রম করব। সে দিন রাসূলগণ ব্যতীত কেউ কথা বলবে না। সে দিন রাসূলগণের বাণী হবে: আল্লাহুম্মা সাল্লিম, সাল্লিম। জাহান্নামে রয়েছে সা‘দানের কাঁটার ন্যায় হুক, তোমরা সা‘দান দেখেছ?” তারা বলল: হ্যাঁ, হে আল্লাহর রাসূল। তিনি বললেন: “তা সা‘দানের কাঁটার ন্যায়, তবে তার বিশালত্বের পরিমাণ আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। সে মানুষদেরকে তাদের আমল অনুযায়ী ছো মেরে নিয়ে নিবে। তাদের কেউ ধ্বংস প্রাপ্ত নিজ আমলের কারণে (জাহান্নামের শুরুতে) রয়ে গেছে, তাদের কেউ টুকরো হয়ে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত অথবা সাজা প্রাপ্ত অথবা তার অনুরূপ। অতঃপর তিনি জাহির হবেন, অবশেষে যখন বান্দাদের ফয়সালা থেকে ফারেগ হবেন ও জাহান্নামীদের থেকে নিজ রহমতে যাকে ইচ্ছা বের করার ইচ্ছা করবেন ফিরিশতাদের নির্দেশ দিবেন যে, জাহান্নাম থেকে বের কর আল্লাহর সাথে যে কোনো বস্তু শরীক করত না, যাদের ওপর আল্লাহ রহম করার ইচ্ছা করেছেন এবং যারা সাক্ষী দেয় যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো হক ইলাহ নেই। তারা জাহান্নামে তাদেরকে সেজদার আলামত দ্বারা চিনবে। আগুন বনি আদমকে সেজদার জায়গা ব্যতীত খেয়ে ফেলবে। সেজদার জায়গা ভক্ষণ করা জাহান্নামের ওপর আল্লাহ হারাম করে দিয়েছেন। তারা জাহান্নাম থেকে বের হবে এমতাবস্থায় যে পুড়ে গেছে, তাদের ওপর সঞ্জীবনী পানি ঢালা হবে, ফলে তারা গজিয়ে উঠবে যেমন গজিয়ে উঠে প্রবাহিত পানির সাথে আসা উর্বর মাটিতে শস্যের চারা। অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদের ফয়সালা থেকে ফারেগ হবেন। অবশেষে শুধু এক ব্যক্তি জাহান্নামের ওপর তার চেহারা দিয়ে অগ্রসর হয়ে থাকবে, সেই জান্নাতে প্রবেশকারী সর্বশেষ জাহান্নামী। সে বলবে: হে আমার রব, আমার চেহারা জাহান্নাম থেকে ঘুরিয়ে দিন, কারণ সে আমার চেহারা বিষাক্ত করে দিয়েছে, তার লেলিহান আমাকে জ্বালিয়ে দিয়েছে। অতঃপর সে আল্লাহর নিকট দো‘আ করবে, আল্লাহ যেভাবে তার দো‘আ করা পছন্দ করেন। অতঃপর আল্লাহ বলবেন: এমন হবে না তো যদি তোমাকে তা দান করি তুমি আমার নিকট অন্য কিছু চাইবে? সে বলবে: না, তোমার ইজ্জতের কসম, এ ছাড়া আপনার নিকট কিছু চাইব না। সে তার রবকে যা ইচ্ছা ওয়াদা ও অঙ্গিকার দিবে, ফলে আল্লাহ তার চেহারা জাহান্নাম থেকে ঘুরিয়ে দিবেন। অতঃপর সে যখন জান্নাতের দিকে মুখ করবে ও তা দেখবে, চুপ থাকবে আল্লাহ যতক্ষণ তার চুপ থাকা চান। অতঃপর বলবে: হে আমার রব আমাকে জান্নাতের দরজার পর্যন্ত অগ্রসর করুন। আল্লাহ তাকে বলবেন: তুমি কি আমাকে তোমার ওয়াদা ও অঙ্গিকার দাওনি যে, আমি তোমাকে যা দিয়েছি তা ছাড়া অন্য কিছু আমার নিকট কখনো চাইবে না? হে বনি আদম সর্বনাশ তোমার, তুমি খুব ওয়াদা ভঙ্গকারী। সে বলবে: হে আমার রব, এবং আল্লাহকে ডাকবে, অবশেষে আল্লাহ বলবেন: এমন হবে না তো যদি তা দেই অপর বস্তু তুমি চাইবে? সে বলবে: না, তোমার ইজ্জতের কসম তা ছাড়া কিছু চাইব না, এবং যত ইচ্ছা ওয়াদা ও অঙ্গিকার প্রদান করবে, ফলে আল্লাহ তাকে জান্নাতের দরজার নিকটবর্তী করবেন। যখন সে জান্নাতের দরজার নিকট দাঁড়াবে তার জন্য জান্নাত উন্মুক্ত হবে, সে তার নি‘আমত ও আনন্দ দেখবে, অতঃপর চুপ থাকবে আল্লাহ যতক্ষণ তার চুপ থাকা চান, অতঃপর বলবে: হে আমার রব আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করান, আল্লাহ বলবেন: তুমি কি ওয়াদা ও অঙ্গিকার দাওনি আমি যা দিয়েছি তা ছাড়া কিছু চাইবে না? তিনি বলবেন: হে বনি আদম সর্বনাশ তোমার, তুমি খুব ওয়াদা ভঙ্গকারী। সে বলবে: হে আমার রব আমি তোমার হতভাগা মখলুক হতে চাই না, সে ডাকতে থাকবে অবশেষে তার কারণে আল্লাহ হাসবেন। যখন হাসবেন তাকে বলবেন: জান্নাতে প্রবেশ কর, যখন সে তাতে প্রবেশ করবে আল্লাহ তাকে বলবেন: চাও, সে তার নিকট চাইবে ও প্রার্থনা করবে, এমনকি আল্লাহও তাকে স্মরণ করিয়ে দিবেন: এটা, ওটা অবশেষে যখন তার আশা শেষ হয়ে যাবে আল্লাহ বলবেন: এগুলো তোমার জন্য এবং এর অনুরূপও তার সাথে”। আতা ইবন ইয়াযিদ বলেন: আবু সাঈদ খুদরী আবু হুরায়রার সাথেই ছিল, আবু হুরায়রার হাদীসের কোনো অংশ তিনি প্রত্যাখ্যান করেননি, অবশেষে যখন আবু হুরায়রা বললেন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: “এগুলো তোমার জন্য এবং এর সমান এর সাথে”। আবু সাঈদ খুদরী বললেন: “এবং তার সাথে তার দশগুণ হে আবু হুরায়রা। আবু হুরায়রা বললেন: আমার শুধু মনে আছে: “এগুলো এবং এর সাথে তার অনুরূপ”। আবু সাঈদ বললেন: আমি সাক্ষী দিচ্ছে আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে তার বাণী: “এগুলো তোমার জন্য এবং তার সমান দশগুণ” খুব ভালো করে স্মরণ রেখেছি। আবু হুরায়রা বললেন: এ ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশকারী সর্বশেষ জান্নাতী”। (সহীহ বুখারী ও মুসলিম) হাদীসটি সহীহ।


৫৭. আবু যর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

“আমি অবশ্যই চিনি জাহান্নাম থেকে নাজাত প্রাপ্ত সর্বশেষ জাহান্নামী ও জান্নাতে প্রবেশকারী সর্বশেষ জান্নাতীকে। এক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হবে, অতঃপর আল্লাহ বলবেন: তার ছোট পাপ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা কর, বড় পাপগুলো গোপন রাখ, অতঃপর তাকে বলা হবে: তুমি অমুক অমুক পাপ, অমুক অমুক দিন করেছ, অমুক অমুক পাপ, অমুক অমুক দিন করেছ। তিনি বলেন: অতঃপর তাকে বলা হবে: তোমার জন্য প্রত্যেক পাপের পরিবর্তে একটি করে নেকি। তিনি বলেন: অতঃপর সে বলবে: হে আমার রব আমি অনেক কিছু করেছি এখানে তা দেখছি না”। তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখেছি হাসতে, এমনকি তার মাড়ির দাঁত পর্যন্ত বের হয়েছিল। (সহীহ মুসলিম ও তিরমিযী) হাদীসটি সহীহ।


 

Was this article helpful?

Related Articles

Leave A Comment?