কয়েকটি সূরা ও সুনির্দিষ্ট আয়াতসমূহ পাঠের প্রতি উৎসাহ প্রদান

কয়েকটি বিশিষ্ট সূরা ও বিশিষ্ট আয়াতসমূহের প্রতি উদ্ধুদ্ধ করা

১০১০. হযরত আবু সাঈদ রাফে’ ইবনে মু’আল্লা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেনঃ মসজিদ থেকে বের হবার আগে কুরআনের শ্রেষ্ঠ মর্যাদা সম্পন্ন সূরাটি কি আমি তোমাকে জানিয়ে দেব না? একথা বলে তিনি আমার হাত ধরলেন। তারপর যখন আমরা মসজিদ হতে বের হতে যাচ্ছিলাম, আমি বললামঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি না বলেছিলেন, আমি অবশ্যই তোমাকে কুরআনের শ্রেষ্ঠ মর্যাদা সম্পন্ন সূরাটি জানিয়ে দেব। জবাবে তিনি বলেনঃ সূরা ফাতিহা। এতে সাতটি আয়াত রয়েছে। যা নামাযে পড়া হয়ে থাকে। আর এটি হচ্ছে উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন কুরআন, যা আমাকে দেওয়া হয়েছে। (বুখারী )


১০১১. হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলূল্লাহ (সাঃ) “যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম, নিঃসন্দেহে এ সূরাটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমান।”

অন্য এক বর্ণনায় আছে, রাসূলূল্লাহ (সাঃ) তাঁর সাহাবা কিরামকে বললেনঃ তোমাদের কেউ কি রাতে এক তৃতীয়াংশ কুরআন পড়তে সক্ষম? সাহাবীদের এটা বড় কঠিন বোধ হল। তাঁরা বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের মধ্যে কোন্‌ ব্যক্তি এর ক্ষমতা রাখে? তিনি বললেনঃ “কুল হুওয়াল্লাহু আহাদ, আল্লাহুস্‌ সামাদ” (সূরা ইখ্‌লাস) হচ্ছে কুরআনের এক তৃতীয়াংশ। (বুখারী)


১০১২. হযরত আবু সাঈদ খুদ্‌রী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। এক ব্যক্তি অন্য এক ব্যক্তিকে ‘কুলহুওয়াল্লাহু আহাদ’ (সূরা ইখলাস) পড়তে শুনল। সে বারবার সেটা পড়ছিল। অতপর যখন ভোর হল তখন প্রথম ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নিকট গিয়ে এ ঘটনা বর্ণনা করল। আর লোকটি যেন এ আমলটিকে সামান্য মনে করছিল। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেনঃ যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ তাঁর কসম, এ সূরাটি অবশ্যই কুরআনের এক তৃতীয়াশের সমান। (বুখারী )


১০১৩. হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) “ক্বুল হুওয়াল্লাহু আহাদ” সম্পর্কে বলেনঃ নিশ্চিত এ সূরাটি কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমান। (মুসলিম)


১০১৪. হযরত আনাস (রা) বর্ণনা করেছেন। এক ব্যক্তি বললঃ ইয়া রাসূলু্‌ল্লাহ! আমি এ “কুলহু ওয়া আল্লাহু আহাদ” সূরাটি ভালোবাসি।” তিনি বললেনঃ “তোমার এ ভালোবাসা তোমাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবে।” (তিরমিযী)


১০১৫. হযরত উকবা ইবন আমির (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ তুমি কি দেখনি, আজ রাতে এমন কতিপয় আয়াত নাযিল হয়েছে যার কোন দৃষ্টান্ত পূর্বে ছিল না? (সে আয়াতগুলো হচ্ছে) “কুল আ’উযূ বিরাব্বিল ফালাক” ও কুল আ’উযূ বিরাব্বিন নাস” অর্থাৎ সূরা ফালাক ও নাস। (মুসলিম)


১০১৬. হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) জিন ও মানুষের নজর লাগা থেকে বাঁচার জন্য আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। এমনকি শেষ পর্যন্ত মুতাওয়াযাতান (কুল আ’উযূ বিরাব্বিল ফালাক ও কুল আ’উযূ বিরাব্বিন নাস) সূরা দু’টি নাযিল হয়। এ সুরা দু’টি নাযিল হওয়ার পর তিনি এ দু’টিকে ঐ উদ্দেশ্যে গ্রহণ করে নিলেন এবং অন্যগুলো পরিত্যাগ করলেন।   (তিরমিযী)


১০১৭. হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ কুরআনের একটি সূরায় তিরিশটি আয়াত রয়েছে। সূরাটি এক ব্যক্তির জন্য শাফা’আত (সুপারিশ) করায় শেষ পর্যন্ত ঐ ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দেয়া হয়। আর এ সূরাটি হচ্ছে “তাবারাকাল্লাযী বি-ইয়াদিহিল মুলক”। (আবু দাঊদ ও তিরমিযী)

ইমাম তিরমিযী বলেছেন হাদীসটি হাসান। আবু দাঊদের এক বর্ণনাতে ‘তাশফাউ’ (শাফায়াত করবে) শব্দ উল্লেখিত হয়েছে।


১০১৮. হযরত আবু মাসঊদ আল-বদরী (রা) নবী করীম (সা) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেনঃ যে ব্যক্তি রাতে সূরা বাকারার শেষ দু’টি আয়াত পাঠ করবে তা তার জন্য যথেষ্ঠ হবে। (বুখারী ও মুসলিম)

‘কাফাতাহু’ শব্দের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছেঃ সে রাতে তার প্রতিকুলে যাবতীয় অনিষ্টের জন্য যথেষ্ট হয়। ব্যাখ্যায় আরো বলা হয়েছে যে, তার নিশি জাগরণের (রাত জেগে ইবাদাত করার) জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়।


১০১৯. হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ তোমাদের ঘরগুলোকে কবরে পরিণত করো না। নিঃসন্দেহে যে ঘরে সূরা বাকারা পড়া হয় সে ঘর থেকে শয়তান পলায়ন করে। (মুসলিম)


১০২০. হযরত উবাই ইবনে কা’ব (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ “হে আবুল মুনযির! তুমি কি জান, তোমার সঙ্গে যে আল্লাহর কিতাব আছে তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ আয়াত কোনটি? আমি বললাম, সে আয়াতটি হচ্ছেঃ “আল্লাহু লা- ইলাহা ইল্লা হুওয়াল হাইয়ূল কাইয়ুম . . .” (আয়াতুল কুরসী) তিনি আমার বুকে হাত মেরে বললেনঃ হে আবুল মুনযির! তোমার ইলম মুবারক হোক। (মুসলিম)


১০২১. হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে রমযানের যাকাত (সাদাকায়ে ফিতর) সংরক্ষণ ও পাহারা দেবার দায়িত্ব দিলেন। এ দায়িত্ব পালনকালে কোন এক চোর এসে খাদ্য বস্তু আঁজল ভরে নিতে লাগল। আমি তাকে ধরে ফেললাম। তাকে বললামঃ আমি তোমাকে অবশ্যই রাসূলুল্লাহ (সা)-এর খেদমতে পেশ করবো। সে বললঃ “আমি একজন অভাবী লোক, সন্তানদের বোঝাও আমার ঘাড়ে আছে এবং প্রয়োজনও আমার অনেক বেশি।” আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। ভোর হলে রাসূলুল্লাহ(সা) আমাকে বললেনঃ “হে আবু হুরাইরা! গত রাতে তোমার কয়েদী কি করল?” আমি বললামঃ “ইয়া রাসূলুল্লাহ! সে তার অভাব ও সন্তানদের কথা বলল, তাই আমি, দয়াপরবশ হয়ে তাকে ছেড়ে দিয়েছি।” তিনি বললেনঃ সে অবশ্যই মিথ্যা বলেছে। তবে সে আবার আসবে। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কথায় আমি জানতে পারলাম, সে আবার আসবে। কাজেই আমি তাকে ধরার জন্য ওঁৎ পেতে রইলাম। সে এসে খাদ্য বস্তু আঁজল ভরে উঠাতে লাগল। আমি বললামঃ তোমাকে আমি অবশ্যই রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে উপস্থিত করব। সে বলল, ‘‘আমাকে ছেড়ে দাও, কারণ আমি অভাবী আর সন্তানদের বোঝাও আমার ওপর আছে। এরপর আমি আর চুরি করতে আসব না।” তার কথায় দয়াপরবশ হয়ে আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। পরদিন ভোরে রাসুলুল্লাহ (সা) আমাকে বললেনঃ “হে আবু হুরাইরা! গতরাতে তোমার বন্দী কি করল? আমি বললামঃ “ইয়া রাসূলুল্লাহ! সে অভাব ও সন্তানের কথা বলল। অতএব আমি দয়াপরবশ হয়ে তাকে ছেড়ে দিলাম।” তিনি বললেনঃ অবশ্য সে তোমাকে মিথ্যা বলেছে। তবে সে আবার আসবে। তারপর আমি তৃতীয়বার তাকে ধরার জন্য ওঁৎ পেতে রইলাম। সে এসে খাদ্য বস্তু আঁজল ভরে সরাতে লাগল। আমি তাকে ধরে ফেললাম। আমি বললামঃ “আমি অবশ্যই তোমাকে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে পেশ করব। কারণ এবার সহ তুমি তিনবার বলেছ যে, তুমি আবার আসবে না। কিন্তু প্রত্যেকবারই তুমি ফিরে এসেছ।” সে বললো, “আমাকে ছেড়ে দিন। আমি আপনাকে এমন কিছু কলেমা শিখিয়ে দিব যার ফলে আল্লাহ আপনাকে লাভবান করবেন।” আমি বললামঃ “সেগুলো কি?” সে বলল, “যখন বিছানায় ঘুমুতে যাবেন আয়াতুল কুরসী পাঠ করবেন, তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার উপর সব সময় একজন হেফাযতকারী নিযুক্ত থাকবে এবং ভোর পর্যন্ত শয়তান আপনার ধারে কাছেও ঘেঁষতে পারবে না।” এ কথা শুনে আমি তাকে ছেড়ে দিলাম। পরদিন ভোরে নবী করীম (সা) আমাকে বললেনঃ “গতরাতে তোমার কয়েদী কি করল?” আমি বললামঃ “ইয়া রাসূলুল্লাহ!” সে ওয়াদা করল যে, সে এমন কিছু কালেমা আমাকে শিখিযে দেবে যার ফলে আল্লাহ আমাকে লাভবান করবেন। ফলে আমি তাকে ছেড়ে দিলাম।” তিনি জিজ্ঞেস করলেনঃ সেগুলো কি? আমি বললামঃ সে আমাকে বললো, আপনি বিছানায় ঘুমুতে যাবার সময় ‘আয়াতুল কুরসি’ পড়বেন। প্রথম থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত। আর সে আমাকে এও বলেছে যে, এর ফলে আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন হেফাজতকারী সব সময় আপনার ওপর নিযুক্ত থাকবে এবং শয়তান ভোর পর্যন্ত আপনার ধারে কাছেও ঘেঁসতে পারবে না। একথা শুনে নবী করীম (সা) বললেনঃ এ কথাটা সে অবশ্য তোমাকে সত্য বলেছে। অথচ সে নিজে হচ্ছে মিথ্যুক। হে আবু হুরাইরা! তুমি কি জান, গত তিন দিন থেকে তুমি কার সাথে কথা বলেছ? আমি বললামঃ না, আমি জানি না। তিনি বললেনঃ সে হচ্ছে শয়তান।    (বুখারী)


১০২২. হযরত আবু দারদা (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি সূরা কাহফের প্রথম দশ আয়াত মুখস্ত করবে সে দাজ্জালের হাত থেকে রক্ষা পাবে। অন্য এক বর্ণনায় আছে, সূরা কাহফের শেষ দশ আয়াত। (মুসলিম)


১০২৩. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদিন হযরত জিবরাঈল (আ) নবী করীম (সা)-এর নিকট বসাবস্থায় ছিলেন। তিনি ওপর থেকে কিছু আওয়াজ শুনতে পেয়ে মাথা উঠিয়ে দেখলেন এবং বললেনঃ এটি হচ্ছে আকাশের একটি দরজা, আজই এটা খোলা হয়েছে। ইতোপুর্বে আর কক্ষনো এটা খোলা হয়নি। এ দরজা দিয়ে একজন ফিরিশতা অবতরণ করলেন। হযরত জিবরীল (আ) বললেনঃ এ ফিরিশতা পৃথিবীতে অবতরণ করেছে। ইতোপুর্বে কক্ষনো সে পৃথিবীতে অবতরণ করেনি। ফিরিশতা তাঁকে সালাম করলেন এবং বললেনঃ সুসংবাদ গ্রহণ করুন, এমন দু’টি নূরের সুসংবাদ গ্রহণ করুন যা আপনাকে দেয়া হয়েছে এবং আপনার পূর্বে আর কোন নবীকে দেয়া হয়নি। সে দু’টি নূর হচ্ছেঃ সূরা ফাতিহা ও সূরা বাকারার শেষ আয়াত। সেগুলোর কোন একটি হরফ পড়লেই আপনাকে তার সওয়াব দেয়া হবে। (মুসলিম)


 

Was this article helpful?

Related Articles

Leave A Comment?