ওলীদের অলৌকিক ঘটনাবলী বা কারামত ও তাঁদের ফযীলত

মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন,

 “জেনে রেখ, আল্লাহর বন্ধুদের জন্য ভয়ের কোন কারণ নেই এবং তাদেরকে দুর্ভাবনাগ্রস্তও হতে হবে না। যারা ঈমান স্থাপন করেছে ও পাপ হতে দূরে থেকেছে। তাদের জন্য পৃথিবীর জীবনে ও পরকালে রয়েছে সুখবর। আল্লাহর কথার কোন ব্যতিক্রম হয় না। এ বিঘোষিত সুখবর বড়ই সাফল্য।” (সূরা ইউনুসঃ ৬২-৬৪)

মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন,

“আর খেজুরের ঐ কাণ্ডটি নিজের দিকে ধরে নাড়া দাও, তা হতে তোমার জন্য পড়বে তারতাজা খেজুর। কাজেই তুমি তা খাও ও পান কর আর চোখ শীতল কর।” (সূরা মরিয়মঃ ২৫-২৬)

তিনি আরো ইরশাদ করেছেন,

 “যখনই যাকারিয়া তাঁর কাছে ইবাদতগাহে আগমন করত তাঁর কাছে দেখতে পেত কিছু খাদ্য। জিজ্ঞেস করত, হে মারইয়াম! এসব তোমার কাছে কোথা হতে এল? তিনি উত্তর দিতেন, এটা আল্লাহ্ কাছ হতে এসেছে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ যাকে চান তাকে অফুরন্ত জীবিকা দান করেন।” (সূরা আলে ইমরানঃ ৩৭)

তিনি আরো ইরশাদ করেন,

 “আর তখন তোমরা (আসহাবে কাহাফ) তাদের হতে পৃথক হয়ে গিয়েছ এবং আল্লাহ্ ব্যতীত তাদের অন্যান্য মাবূদদের হতেও। কাজেই এখন তোমরা (অমুক) গুহার মধ্যে গিয়ে আশ্রয় নাও। তোমাদের ওপর তোমাদের আল্লাহ্ তাঁর করুণা ছড়িয়ে দিবেন, আর তোমাদের জন্য তোমাদের কাজে সাফল্যের সরঞ্জাম প্রস্তুত করে দিবেন। আর তুমি তারেদকে গুহার ভেতরে অবলোকন করতে পারলে দেখতে, সূর্য যখন উদয় হয় তখন তাদের গুহা ছেড়ে ডান দিক হতে উপরে উঠে যায় আর যখন অস্ত যায় তখন তাদের হতে আড়াল হতে বাম দিকে নেমে যায়।” (সূরাঃ কাহাফঃ ১৬-১৭)

 

১৫০৩. হযরত আবু মুহাম্মদ আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর সিদ্দীক (রা) থেকে বর্ণিত। (তিনি বলেছেন,) আসহাবে সুফ্ফা ছিলেন একান্তই দরিদ্র অভাবী জনগোষ্ঠী। তাই একবার নবী করীম (স) বললেন, যার কাছে দু’জনের খাদ্য রয়েছে সে যেন তার সাথে তৃতীয় জনকে নিয়ে খায়, আর যার কাছে চারজনের খাদ্য রয়েছে সে যেন তার সাথে পঞ্চম ও ষষ্ঠজনকে নিয়ে খায়। অথবা তিনি যেমন বলেছেন। কাজেই (এ নীতি অনুযায়ী) হযরত আবু বকর (রা) তিন ব্যক্তিকে তাঁর সঙ্গে করে নিয়ে এলেন। আর তাঁর সঙ্গে আনলেন দোষ ব্যক্তিকে। হযরত আবু বকর (রা) নবী করীম (স)-এর সাথে রাতের খাবার খেলেন, এরপর তাঁর সঙ্গে অবস্থান করলেন এশার নামায আদায় করা পর্যন্ত। এরপর সেখান হতে ফিরলেন। তখন রাতের একটা অংশ যতটুকু আল্লাহ চান অতিবাহিত হয়ে গিয়েছিল। তাঁর স্ত্রী বলেন, অতিথিদের ছেড়ে তুমি কোথায় রয়ে গিয়েছিলে? তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি অতিথিদেরকে আহার করাওনি? স্ত্রী উত্তর দিলেন, তাঁরা অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, তুমি না আসা পর্যন্ত তাঁরা খাবেন না। অথচ তাদেরকে বারবার বলা হয়েছিল। আবদুর রহমান (রা) বলেছেন, (এ দৃশ্য দেখে) আমি ভয়ে আত্মগোপন করেছিলাম। হযরত আবু বকর (রা) বললেন, ওহে নির্বোধ। এরপর তিনি যার পর নেই তিরস্কার করতে লাগলেন। এরপর তিনি (অতিথিদেরকে) বললেন, তোমরা খেয়ে নাও, তোমাদের জন্য বরকত হবে না, আল্লাহ্র কসম আমি খাব না। আবদুর রহমান (রা) বলেন, আল্লাহ্র শপথ, আমরা যখনই কোন লোক্মা গ্রহণ করতাম তার নিচে হতে তা আরও বেশি বেড়ে ওপরে এসে যেত। এমন কি সবাই পেট ভরে আহার করল। এদিকে খাবার পূর্বের চেয়ে অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়ে গেল। হযরত আবু বকর (রা) তা দেখে তাঁর স্ত্রীকে বললেন, হে বনী ফিরাসের বোন, এ কি ব্যাপার! তিনি উত্তর দিলেন, না, না আমার চোখের শীতলতা (অর্থাৎ হে আমার প্রিয় স্বামী!), এত এখন দেখছি পূর্বের চেয়ে তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়ে গেছে। কাজেই আবু বকর (রা) তা হতে খেলেন। তারপর বললেন, এটা ছিল মূলে শয়তানের পক্ষ হতে। এরপর তা হতে এক লোক্মা খেলেন এবং অবশিষ্ট সবটুকু উঠিয়ে নবী করীম (স)-এর কাছে নিয়ে এলেন। সকাল পর্যন্ত ঐ খাবার গুলো তাঁর কাছে রয়ে গেল। সে সময় একটি গোত্রের সাথে আমাদের সন্ধি চুক্তি ছিল। চুক্তির সময় শেষ হয়ে গিয়েছিল। অতএব রাসূলুল্লাহ (স) আমাদের বারজনকে গোয়েন্দা নিযুক্ত করেছিলেন এবং (এই বারজনের) প্রত্যেকের সাথে লোকদের একটি দল ছিল যার সংখ্যা একমাত্র আল্লাহ্ই জানেন। মোটকথা তারা সবাই ঐ খাবার পেট ভরে খেল।

অন্য একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, তখন হযরত আবু বকর (রা) কসম খেলেন, যে তিনি খাবার খাবেন না। এ দৃশ্য দেখে মেহমান বা মেহমানরাও কসম খেলেন, তারা খাবার খাবেন না যে পর্যন্ত না আবু বকর (রা) খাবার খান। এ অবস্থা দেখে আবু বকর (রা) বললেন, এটা (অর্থাৎ এই কসম) ছিল শয়তানের পক্ষ হতে। কাজেই তিনি খাবার আনালেন। তিনি নিজে খেলেন, এবং মেহমানরাও খেলেন। তাঁরা সবাই এক লোকমা খাবার উঠাতে না উঠাতেই তার নিচে তার চেয়ে বেশি হয়ে যেত। আবু বকর (তাঁর স্ত্রীকে) বললেন, হে বনী ফিরাসের বোন, একি ব্যাপার! তিনি বললেন, হে আমার চোখের শীতলতা (অর্থাৎ হে আমার প্রিয় স্বামী)! এতো দেখছি এখন আমাদের খাবার আগের চাইতে অনেক বেশি হয়ে গেছে। কাজেই সবাই খেলেন এবং (অবশিষ্ট) খাবার নবী করীম (স)-এর খেদমতে পাঠিয়ে দিলেন। বর্ণনাকারী বর্ণনা করেছেন যে, নবী করীম (স)-ও তা হতে খেয়েছেন।

অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে, হযরত আবু বকর (রা) আবদুর রহমানকে বললেন, তুমি তোমার এ অতিথিদের দেখাশুনা কর। কারণ আমি একটু নবী করীম (স)-এর কাছে যাচ্ছি। আমার আসার পূর্বেই তুমি এদের মেহমানদারী শেষ করে ফেল। এরপর আবদুর রহমান (রা) চললেন এবং তাঁর কাছে (অর্থাৎ গৃহে) যা কিছু ছিল অতিথিদের সামনে এনে হাজির করলেন। তিনি (অতিথিদেরকে) বললেন, আপনারা খেয়ে নিন। অতিথিরা জিজ্ঞেস করলেন, আমাদের গৃহস্বামী কোথায়? আবদুর রহমান (রা) বললেন, আপনারা খেয়ে নিন। তারা বললেন, আমাদের গৃহস্বামী না এলে আমরা খাব না। আবদুর রহমান (রা) বললেন, আমাদের পক্ষ হতে মেজবানী গ্রহণ করুন (এবং খাবার খেয়ে নিন)।

কারণ যদি আবু বকর (রা) এসে পড়েন এবং তখনো পর্যন্ত আপনারা খাবার না খেয়ে থাকেন তবে তাঁর পক্ষ হতে আমাদের কষ্ট পোহাতে হবে। তবুও তাঁরা খেতে অস্বীকার করল। আমি বুঝতে পারলাম আজ আমার ওপর তিনি চটে যাবেন। তারপর যখন আবু বকর (রা) এলেন, আমি সরে পড়লাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা (মেহমানদের ব্যাপারে) কি করেছ? ঘরের লোকেরা তাঁকে অতিথিদের না খেয়ে থাকার কথা জানিয়ে দিল। তিনি ডাক দিলেন, হে আবদুর রহমান! আমি কোন সাড়া দিলাম না। এবার তিনি ডাক দিলেন, ওরে নির্বোধ। আমি তোকে কসম দিয়ে বলছি, আমার কথা শুনে থাকলে চলে আয়। আমি বের হয়ে এলাম এবং বললাম, আপনার অতিথিরেদকে জিজ্ঞেস করুন। তাঁরা বললেন, যথার্থই, সে আমাদের কাছে খানা এনেছিল। তিনি বললেন, তোমরা আমার জন্য অপেক্ষা করেছ। আল্লাহ্র কসম! আমি আজ রাতে খাবার খাব না। একথা শুনে অন্য সবাই বলল, আল্লাহ্র কসম! আপনি না খেলে আমরাও খাব না। তখন তিনি বললেন, হায়, আফসোস! জানি না তোমাদের কি হয়েছে, তোমরা আমাদের মেহমানদারী গ্রহণ করছ না কেন? খানা আন। এরপর খানা আনা হল এবং আবু বকর খাবারের ওপর নিজের হাত রাখলেন, এরপর বললেন, ‘বিসমিল্লাহ’।  আগেরটা ছিল শয়তানের পক্ষ থেকে। তিনি নিজেও খেলেন এবং তারা সবাই খেলেন। (বুখারী ও মুসলিম)


১৫০৪. হযরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) ইরশাদ করেছেন, তোমাদের পূর্বের উম্মতের মধ্যে অনেক ‘মুহাদ্দাস’ হতো। কাজেই আমার উম্মতের মধ্যে যদি কোন ‘মুহাদ্দাস’ হয় তবে তা হবে ওমর।

ইমাম বুখারী এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আর ইমাম মুসলিম (র) হযরত আয়েশার মাধ্যমে এটি বর্ণনা করেছেন। আর তাঁদের উভয়ের (অর্থাৎ বুখারী ও মুসলিম) বর্ণনাতে মুহাদ্দাস ইবনে ওহাবের মন্তব্য উল্লিখিত হয়েছে। তাতে তিনি বলেছেন, ‘মুহাদ্দাস’ তাদেরকে বলা হয় যাদের ওপর আল্লাহ্ পক্ষ হতে ‘ইলহাম’ হয়।


১৫০৫. হযরত জাবের ইবনে সামুরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, কূফাবাসীরা (সা’দ ইবনে আবূ ওয়াক্কাস) বিপক্ষে ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা)-এর কাছে অভিযোগ করল। তিনি তাকে অপসারণ করে আম্মারকে তাদের জন্য নিযুক্ত করলেন। তারা এবারও অভিযোগ করল। এমনকি তারা বর্ণনা করল, তিনি হযরত সা’দ (রা) নামাযও ভাল পড়ান না। এরপর হযরত ওমর (রা) দূত পাঠালেন হযরত সা’দের কাছে। (হযরত সা’দ) (হযরত ওমরের কাছে হাজির হলে) তিনি (সা’দকে) বললেন, হে আবু ইসহাক! কুফাবাসীদের ধারণা তুমি নাকি নামাযও ভাল করে পড়াও না। সা’দ (রা) উত্তর দিলেন, আমি তো, আল্লাহ্র শপথ, তাদেরকে রাসূলুল্লাহ (স)-এর মতো নামায আদায় করাই, তার মধ্যে আমি কোন কমতি করি না, আমি তাদেরকে মাগরিব ও এশার নামায আদায় করাই। এর প্রথম দু’রাকাত লম্বা ও শেষ দু’রাকাত হাল্কা করি। ওমর (রা) বললেন, হে আবু ইসহাক! তোমার ব্যাপারে আমারও এ ধারণা ছিল। তিনি সা’দের সাথে একজন বা কয়েকজন ব্যক্তিকে কূফায় পাঠালেন। কূফাবাসীদের কাছে তাঁর সম্পর্কে জিজ্ঞেসাবাদ করার জন্য। কাজেই তারা কোন একটি মসজিদেও জিজ্ঞাসাবাদ করতে ছাড়লেন না। সব মসজিদের লোকেরাই তাঁর প্রশংসা করতো। অবশেষে তারা বনী আবসের মসজিদে এলেন। সেখানে মসজিদের লোকদের মধ্য হতে একজন দাঁড়াল, তার নাম ছিল উসামা ইবনে কাতাদা এবং ডাক নাম ছিল আবু সা’দা। সে বলল, যখন আমাদের জিজ্ঞেসই করা হয়েছে (তখন আমি বলেই দিচ্ছি,) সা’দ (রা) কখনো কোন সেনাদলের সাথে (যুদ্ধে) গমন করেন না এবং গনীমতের সম্পদ সমানভাবে বন্টন করেন না। আর রাষ্ট্রীয় ব্যাপারেও ন্যায়বিচার করেন না। সা’দ (রা) বললেন, সাবধান আল্লাহ্র শপথ, আমিও তিনটি বদ্ দোয়া দেব। (এ সময় হযরত সা’দ (রা) আবেগ প্রবণ হয়ে পড়লেন এবং বললেন,) হে আল্লাহ্! যদি তোমার এ দাস মিথ্যুক হয়ে থাকে এবং লোক দেখাবার ও খ্যাতি অর্জন করার জন্য দাঁড়িয়ে থাকে, তবে তার আয়ু দীর্ঘ করে দাও, তার দারিদ্র ও অনাহারকে দীর্ঘ করে দাও এবং তাকে ফিত্নার মধ্যে নিক্ষেপ কর। কাজেই এ বদ্ দেয়ার পর যখন সেই ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করা হতো, সে বলত, বুড়ো, থুরথুরে বুড়ো, ফিত্নার মধ্যে ডুবে গেছে, আমাকে সা’দের বদ্দোয়া লেগেছে। বর্ণনাকারী আবদুল মালেক ইবনে ওমায়ের জাবের ইবনে সামুরা (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। জাবের (রা) বলেন, আমি তাকে দেখেছি। বুড়ো হওয়ার কারণে তার চোখের পাতা চোখের ওপর ঝুলে পড়েছিল এবং সে পথে ঘাটে যুবতী মেয়েদেরকে টানাটানি করত ও তাদেরকে জ্বালাতন করে ফিরত। (বুখারী ও মুসলিম)


১৫০৬. হযরত উরওয়াহ ইবনে যোবায়ের (রা) থেকে বর্ণিত। সাঈদ ইবনে যায়েদ ইবনে আম্র ইবনে নুফাইল (রা)-এর সাথে আরওয়া বিনতে আওসের একটি ভূমি নিয়ে বিবাদ বাধে। আরওয়া মারওয়ান ইবনুল হাকামের (মদীনার তদানীন্তন শাসক) কাছে (সাঈদ ইবনে যায়েদের বিপক্ষে) বিচার প্রার্থী হয়ে দাবি জানাল, সাঈদ তার যমীনের কিছু অংশ গ্রাস করে নিয়েছেন। (এ দাবির উত্তরে) সাঈদ (রা) বলেন, রাসূল (স) হতে আমি যা শুনেছি তারপরও তার ভূমির কিছু অংশ আমি গ্রাস করব (এটা কেমন করে হতে পারে)।  মারওয়ান জিজ্ঞেস করলেন, আপনি রাসূলুল্লাহ (স) হতে কি শুনেছেন? সাঈদ (রা) উত্তর দিলেন, আমি রাসূলুল্লাহ্ (স) হতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কারো থেকে জুলুম করে এক বিঘত ভূমিও নেবে (কেয়ামতের দিন) তার গলায় সাতটি যমীনের বেড়ী পরিয়ে দেয়া হবে। মারওয়ান তাঁকে বললেন, হে আল্লাহ্! যদি এ মহিলা (আরওয়াহ ইবনে আওস) মিথ্যাবাদী হয় তবে তার চোখ অন্ধ করে দাও এবং তাকে তার ভূমিতেই মৃত্যু দাও। উরওয়াহ ইবনে যোবায়ের (র) বলেন, এ মহিলা মরেনি যতদিন না সে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। আর একদিন সে (অন্ধ অবস্থায়) তার যমীনের ওপর দিয়ে যাচ্ছিল, এমন সময় একটি গর্তের মধ্যে পড়ে যায় এবং তাতে তার মৃত্যু ঘটে। (বুখারী ও মুসলিম)


১৫০৭. হযরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, উহুদ যুদ্ধের সময় আমি উপস্থিত হলাম সে রাতে আমার আব্বা আমাকে ডেকে বললেন, আমার মনে হচ্ছে, নবী করীম (স)-এর সাহাবাদের মধ্যে (আগামীকালের যুদ্ধে) আমিই সর্বপ্রথম শহীদ হব। আর রাসূল (সা) –এর পর তুমিই আমার সবচেয়ে বেশি প্রিয়। আমার ওপর কিছু ঋণের বোঝা রয়েছে, তা তুমি আদায় করে দিবে এবং তোমার বোনদের সাথে সদাচরণ করবে। কাজেই সকালে (যুদ্ধ আরম্ভ হল) তিনিই প্রথম শহীদ হলেন। আমি (রাসূলুল্লাহ (স)-এর হিদায়েত অনুযায়ী) আর একজন শহীদকে তাঁর সাথে একই কবরে দাফন করলাম। এরপর আমার মন এটা চাইল না যে আমি তাঁকে আরেকজনের সাথে রেখে দেই, তাই ছয় মাস পর আমি তাকে সেখান হতে বের করে নিলাম। তখন তিনি ঠিক তেমনটিই ছিলেন যেমনটি সেখানে রাখার দিন ছিলেন। কেবল তাঁর কানটি ছাড়া (তাতে সামান্য ঘা ছিল)।  এরপর আমি তাঁকে অপর একটি কবরে পৃথকভাবে দাফন করলাম। (বুখারী)


১৫০৮. আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। নবী (স)-এর দু’জন সাহাবী এক অন্ধকার রাতে নবী করীম (স)-এর কাছ হতে বের হলেন। তাদের দু’জনের সাথে ছিল প্রদীপের মতো দু’টি আলো। যখন তারা দু’জন পৃথক হয়ে গেলেন তাদের প্রত্যেকের সাথে একটি করে প্রদীপ হয়ে গেল। এভাবে তারা নিজেদের ঘরে পৌঁছে গেলেন। (বুখারী)


১৫০৯. ইমাম বুখারী বিভিন্ন সনদ সূত্রে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। এ বর্ণনাগুলোর কোন কোনটিতে বলা হয়েছে যে, ঐ দু’জন সাহাবীর একজন ছিলেন উসাইদ ইবনে হুদাইর (রা) এবং অন্যজন ছিলেন আব্বাদ ইবনে বিশর (রা)।

হযরত আবু হোরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত । তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ (স) দশজন ব্যক্তির একটি দলকে সৈন্যবাহিনীর পক্ষ হতে গোপন তথ্য সংগ্রহ করার জন্য পাঠালেন। আসেম ইবনে সাবেত আনাসরী (রা)-কে তাঁদের নেতা মনোনীত করলেন। নির্দেশ অনুযায়ী তাঁরা রওয়ানা হয়ে যান। যখন তাঁরা আরাফাত ও মক্কার মাঝে হুদাত নামক স্থানে পৌঁছেন তখন হুযাইল গোত্রকে যাদেরকে বনী লিহ্ইয়ানও বলা হয়ে থাকে খবর দিয়ে দেয়া হয়। ফলে তাঁরা তাদের প্রায় একশ’ জন তীরন্দাজ নিয়ে বের হয় এবং তাঁদের পায়ের চিহ্ন ধরে চলতে থাকে। আসেম ও তাঁর সাথীগণ যখন পশ্চাদধাবন অনুধাবন করতে পরলেন তখন তাঁরা একটি উঁচু স্থানে আশ্রয় নেন। কাফেররা তাঁদেরকে চারদিক হতে ঘিরে ফেলে বলতে থাকে, নেমে এসো এবং নিজেদেরকে আমাদের হাতে সোপর্দ কর। আমরা তোমাদের সাথে এ মর্মে চুক্তিবদ্ধ হচ্ছি, তোমাদের কাউকে আমরা হত্যা করব না। আসেম ইবনে সাবেত (রা) বলেন, “হে সঙ্গীগণ! আমি নিজেকে কাফেরদের জিম্মায় সোপর্দ করব না। হে আল্লাহ্! তোমার নবী করীম (স)-কে আমাদের খবর জানিয়ে দাও।” (এ কথা শুনে) কাফেররা তাঁর প্রতি তীর বর্ষণ করল এবং আসেমকে শহীদ করল। এরপর কাফেরদের অঙ্গীকারের ওপর ভরসা করে তিন ব্যক্তি তাদের কাছে নেমে আসে। তাঁদের মধ্যে ছিলো খুবাইব, যায়েদ ইবনুদ দাসিনাহ ও তৃতীয় একজন। কাফেররা তাঁদের ওপর নিয়ন্ত্রণ লাভ করার পর তাঁদের ধনুকের ছিলা দিয়ে তিনজনকে বেঁধে ফেলল। এ অবস্থায় দেখে তৃতীয় ব্যক্তিটি বললেন, “এটা হচ্ছে প্রথম বিশ্বাসঘাতকতা। আল্লাহ্র শপথ! আমি তোমাদের সাথে যাব না। আমার জন্য রয়ে গেছে ঐ শহীদদের আদর্শ (শহীদ হওয়া)।  কাফেররা তাঁকে ধরে টানতে থাকে এবং তাঁকে নিয়ে যাবার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাতে থাকে। কিন্তু তিনি যেতে অস্বীকার করেন। তখন তারা তাঁকে ধরে শহীদ করে দেয়। অতঃপর কাফেররা খুবাইব ও যায়েদ ইবনে দাসিনাহকে সঙ্গে নিয়ে চলে এবং তাঁদেরকে মক্কায় বিক্রয় করে দেয়। এটা বদর যুদ্ধের পরের ঘটনা। খুবাইবকে ক্রয় করে নেয় হারেস ইবনে আমের ইবনে নওফেল ইবনে আবদে মানাফের বংশধররা। আর বদরের দিন খুবাইবই হারেসকে হত্যা করেছিলন। কাজেই খুবাইব (রা) তাদের কাছে বন্দি হলেন। অবশেষে তারা তাঁকে হত্যা করার ব্যাপারে একমত হয়। এ সময় তিনি হারেসের এক মেয়ের কাছ হতে একটি ক্ষুর চেয়ে নেন, নিজের নাভিমূলের ক্ষৌর কর্ম সম্পন্ন করার জন্য। মেয়েটি তাঁকে তা দিয়ে দেন। তার একটি শিশু পুত্র খুবাইবের কাছে চলে যায়। পুত্রের ব্যাপারে তিনি অলস হয়ে পড়েছিলেন। মেয়েটি যখন খুবাইবের কাছে আসেন, দেখেন তার ছেলেটি বসে আছে খুবাইবের হাঁটুর ওপর এবং খুবাইবের হাতে রয়েছে ক্ষুর। তিনি ভীষণ ঘাবড়ে যান। খুবাইর (রা) তার আশঙ্কা টের পান। তিনি তাকে বললেন, “তুমি ভয় পেয়ে গিয়েছ বুঝি আমি একে হত্যা করব ভেবে। আমি কখনোই এ কাজ করব না।” হারেসের মেয়ে বলেন, “আল্লাহর শপথ! আমি খুবাইবের চেয়ে উত্তম কয়েদী আর দেখিনি। আল্লাহ্র শপথ! একদিন আমি তাঁকে দেখেছি তিনি শিকলে বাঁধা অবস্থায় আংগুলের ছড়া হাতে নিয়ে তা হতে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছিলেন অথচ সে সময় মক্কায় ফলের মওসুম ছিল না” হারিস কন্যা বলেন, “নিঃসন্দেহে তা ছিল এমন একটি রিযক যা আল্লাহ্ খুবাইবকে দান করেছিলেন।” তারপর যখন কাফেররা তাঁকে হত্যা করার জন্য হারাম শরীফের বাইরে হিল নামক স্থানে নিয়ে যায়, তখন খুবাইব (রা) তাদেরকে বলেন, “আমাকে ছেড়ে দাও, আমি দু’রাকাত নামায আদায় করব।” তারা তাঁকে ছেড়ে দেয় এবং তিনি দু’রাকাত নামায আদায় করে নেন। এরপর বলেন, “আল্লাহর শপথ, যদি তোমাদের একথা ধারণা করার সম্ভাবনা না থাকত যে, আমি ভয় পেয়ে গেছি, তবে আমি আরো বেশি নামায আদায় করতাম। হে আল্লাহ্! এদের সংখ্যা গুণে রেখ। এদের সবাইকে একের পর এক হত্যা কর। আর এদের একজনকেও ছেড়ে দিও না।” এরপর তিনি নিম্নোক্ত কবিতাটি পাঠ করেন,

“মুসলিম হিসেবেই আমি মরতে যাচ্ছি যখন আমার নেই কোন পরোয়া নেই আল্লাহর পথে কিভাবে আমার প্রাণটি যাবে। আমার মৃত্যু হচ্ছে আল্লাহর পথে, আর কর্তিত জোড়সমূহের ওপর বরকত অবতীর্ণ করেন যদি তিনি চান।”

আর হযরত খুবাইব (রা) ছিলেন সর্বপ্রথম মুসলমান যিনি আল্লাহর রাস্তায় গ্রেফতার হয়ে মৃত্যুবরণকারীদের জন্য নিহত হওয়ার পূর্বে নামায কায়েম করার সুন্নাত জারী করেন। যেদিন এদেরকে শহীদ করা হয় সেদিনই তিনি (নবী করীম (স) তাঁর সাহাবাদেরকে তা জানিয়ে দেন। আসিম ইবনে সাবিকের নিহত হওয়ার খবর পাওয়ার পর কুরাইশদের কিছু ব্যক্তি তাকে চিহ্নিত করার জন্য তার লাশের কিছু অংশ নিয়ে আসার উদ্দেশ্যে তাঁর কাছে প্রেরণ করেন। কারণ আসিম (বদরের দিন) একজন কুরাইশ প্রধানকে হত্যা করেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা সংরক্ষণের জন্য মেঘ খণ্ডের মতো একদল মৌমাছি প্রেরণ করেন। তারা কুরাইশদের প্রেরিত কিছু হতে আসিমের দেহকে হেফাজত করে। ফলে তারা আসিমের দেহ হতে কিছুই কেটে নিতে সক্ষম হয়নি। (বুখারী)


১৫১০. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, “ওমর (রা) যখনই কোন জিনিস সম্পর্কে বলতেন, যে আমি এটা সম্পর্কে এই ধারণা করি তখন সে জিনিসটি তাঁর ধারণা মতেই হয়ে যেত।” (বুখারী)


 

Was this article helpful?

Related Articles

Leave A Comment?