সংযম অবলম্বন ও সন্দেহজনক বস্তু সংক্রান্ত বর্ণনা

সংযম অবলম্বন ও সন্দেহজনক বস্তু পরিহার করার বর্ণনা

[Note: এ অধ্যায়ের কুরআনের আয়াত গুলো পরে আপডেট করা হবে]

 

৫৮৮. নু’মান ইবনে বাশীর (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছিঃ হালালও সুস্পষ্ট, হারামও সুস্পষ্ট এবং এ দু’টির মাঝে রয়েছে কিছু সংশয়পূর্ণ জিনিস, (যেগুলোর হালাল ও হারাম হওয়ার বিষয়টি প্রচ্ছন্ন), যেগুলো সম্পর্কে অধিকাংশ লোকই জানে না। যে ব্যক্তি এসব সন্দেহপূর্ণ জিনিস থেকে দূরে থাকবে সে তার দ্বীন ইজ্জতকে নিরাপদ করল। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি সন্দেহপূর্ণ বিষয়ে জড়িয়ে পড়লো, সে হারামের মধ্যে পতিত হলো। তার দৃষ্টান্ত ঐ রাখালের ন্যায় যে চারণভূমির আশেপাশে তার মেষপাল চরায়। এরূপ অবস্থায় মেষপালের তাতে ঢুকে পড়ার আশংকা থাকে। জেনে রাখ, প্রতি সরকারের জন্য একটি নির্দিষ্ট চারণভূমি রয়েছে। আল্লাহর নির্ধারিত চারণভূমি হচ্ছে তার হারাম করা জিনিসসমূহ। আরো জেনে রাখ, মানুষের শরীরে এক টুকরা গোশত রয়েছে। সেটি সুস্তু ও দোষমুক্ত থাকলে সমগ্র শরীরও সুস্থ ও দোষমুক্ত থাকে এবং সেটি দূষিত ও অসুস্থ হলে সমগ্র শরীরই দূষিত ও অসুস্থ হয়ে যায়। জেনে রাখ, সেটা হচ্ছে দিল বা অন্তঃকরণ।

ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম এ হাদীসটি উদ্বৃত করেছেন। তাঁরা উভয়ে অন্যান্য সূত্রেও প্রায় একই শব্দে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।


৫৮৯. আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) রাস্তায় পতিত একটি খেজুর পেলেন। তখন তিনি বলেনঃ এটি যদি যাকাতের খেজুর হওয়ার আশংকা না হত তাহলে অবশ্যই আমি এটি খেতাম। (বুখারী।মুসলিম)


৫৯০. নাওয়াস ইবনে সাম’আন (রা) থেকে বর্ণিত। নবী (সা) বলেনঃ পুণ্য ও সততা সচ্চরিত্রেরই অপর নাম। গুনাহ হল সেই জিনিস যা তোমার অন্তরে সন্দেহ সৃষ্টি করে এবং সেটি জেনে ফেলুক তা তুমি অপছন্দ কর।  (মুসলিম)


৫৯১. ওয়াবিসা ইবনে মা’বাদ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) -এর নিকট এলাম। তিনি বলেনঃ তুমি কি নেক (ও গুনাহ) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে এসেছে? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বলেনঃ তোমার অন্তরকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস কর (তোমার অন্তরই তার সাক্ষ্য দেবে)।  নেক ও সৎ স্বভাব হলঃ যার উপর আত্মা তৃপ্ত থাকে এবং হৃদয় প্রশান্তি লাভ করে। আর গুনাহ হল যা মনে খটকা ও সংশয়ের সৃষ্টি করে এবং অন্তরে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার উদ্রেক করে— যদি লোকে তোমাকে ফতোয়া দেয় বা তোমাকে ফতোয়া জিজ্ঞেস করে।

হাদীসটি হাসান। আহমাদ ও আদ-দারিমী তাঁদের নিজ নিজ মুসনাদে এটি বর্ণনা করেছেন।


৫৯২. আবু সিরওয়া’আহ উকবা ইবনুল হারিস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি আবু ইহাব ইবনে আযীযের কন্যাকে বিবাহ করেন। তারপর তাঁর নিকট এক মহিলা এসে বলল, উকবা ও আবু ইহাবের কন্যা, যার সাথে সে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হয়েছে, উভয়কে আমি দুধ পান করিয়েছি। উকবা (রা) বলেন, আমার তো জানা নেই যে, আপনি আমাকে দুধ পান করিয়েছেন এবং আপনিও তা আমাকে জানাননি। এরপর উকবা (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) -এর নিকট মদিনার উদ্দেশ্যে চলে গেলেন এবং এ বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ তাহলে তুমি কিভাবে তাকে (নিজের বিবাহে) রাখবে? অথচ বলা হয়েছে (যে, সে তোমার দুধবোন)।   কাজেই উকবা (রা) তাকে পৃথক করে দিলেন। সে মহিলা পরে আরেকজনের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়।     (বুখারী)


৫৯৩. হাসান ইবনে আলী (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে আমি একথাটি স্মৃতিপটে সংরক্ষণ করেছিঃ যে জিনিস তোমাকে সন্দেহে ফেলে তা ছেড়ে দাও এবং যা তোমাকে কোনরূপ সন্দেহে ফেলে তা গ্রহণ কর।

ইমাম তিরমিযী হাদীসটি উদ্ধৃত করেছেন। ইমাম তিরমিযী বলেন, এটি হাসান ও সহীহ। এ হাদীসের অর্থ হচ্ছে সন্দেহপূর্ণ জিনিসের পরিবর্তে সন্দেহমুক্ত জিনিস গ্রহণ কর।


৫৯৪. আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবু বকর সিদ্দিক (রা)-এর একটি গোলাম ছিল। সে তাকে নিজ উপার্জনের খাজনা দিত। আবু বকর (রা) তার প্রদত্ত খাজনা ভোগ করতেন। একদিন সে কিছু একটা নিয়ে এলো। আবু বকর (রা) তা থেকে কিছু খেলেন। গোলামটি তাঁকে বলল, আপনি কি জানেন এটা কি? আবু বকর (রা) বলেনঃ কি এটা? গোলামটি বলল, আমি জাহিলিয়াতের যুগে এক লোকের হাত গুনেছিলাম। আর গণনাও আমি তেমন জানতাম না। আমি বরং তাকে ধোঁকা দিয়েছিলাম। সে আমার সাথে সাক্ষাত করে আমাকে এ জিনিসটি দিয়েছিল (অর্থাৎ আগের গণনার বিনিময়)।  আপনি তাই খেলেন। আবু বকর (রা) মুখে হাত ঢুকিয়ে তাঁর পেটে যা ছিল সব বমি করে ফেলে দিলেন। (বুখারী)


৫৯৫. নাফে’ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) প্রথম স্তরের হিজরাতকারীদের মাথাপিছু (বাৎসরিক) চার হাজার দিরহাম ভাতা নির্ধারণ করেন, কিন্তু তাঁর নিজ পুত্রের জন্য নির্ধারণ করেন তিন হাজার পাঁচশত দিরহাম। তাঁকে বলা হল, আপনার পুত্রও তো মুহাজিরদের অন্তর্ভুক্ত। তাঁর ভাতা কম করলেন কেন? তিনি বলেন, তার সাথে তার পিতাও হিজরত করেছে অর্থাৎ যারা সরাসরি একাকী হিজরাত করেছে সে তাদের সমান (মর্যাদাসম্পন্ন) নয়।   (বুখারী)


৫৯৬. আতিয়্যা ইবনে উরওয়া আস-সা’দী সাহাবী (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ বান্দা ততক্ষণ পর্যন্ত মুত্তাকীদের মর্যাদায় উন্নীত হতে পারে না, যতক্ষণ না সে অবাঞ্ছিত জিনিস থেকে বাঁচার জন্য নির্দোষ জিনিস ত্যাগ করে।

ইমাম তিরমিযী এ হাদীস বর্ণনা করেছেন। তিনি আরো বলেছেন, হাদীসটি হাসান।*

* উপরের হাদীসগুলোর সারকথা হল, প্রকাশ্য আমলের যথাযথ মূল্যায়ন আন্তরিক ও আভ্যন্তরীণ পবিত্রতা ও বিশুদ্ধতার উপরই নির্ভরশীল। অন্তর যদি যাবতীয় পার্থিব লালসা-বাসনা থেকে মুক্ত থাকে, তাহলে সন্দেহপুর্ণ জিনিস থেকে বেঁচে থাকা অতি সহজ। ভীতির অনিবার্য ফল হল, বান্দা কোন প্রকারেই শরীয়াত নির্ধারিত সীমার বাইরে যাবে না। কিন্তু আল্লাহভীতিই যদি না থাকল, তাহলে সে যে কোন প্রকার অন্যায় কাজ যথেচ্ছাভাবে করে যেতে পারে।


 

Was this article helpful?

Related Articles

Leave A Comment?