শাসকের গুনাহমুক্ত অনুগত্য করা ওয়াজিব এবং গুনাহের ব্যাপারে তাদের আনুগত্য করা হারামের বর্ণনা

আল্লাহর নাফরমানী না হলে শাসকের আনুগত্য করা আবশ্যক; কিন্তু আল্লাহর অবাধ্যতায় তাদের আনুগত্য হারাম

আল্লাহ তায়ালা বলেছেনঃ

“হে ঈমানদারেরা! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর আর তোমাদের মধ্য থেকে যারা কর্তৃত্বশীল তাদের আনুগত্য কর।” (সূরা নিসাঃ ৫৯)

 

৬৬৩. ইবনে উমার (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ প্রত্যেক মুসলিমের উপর (শাসকের নির্দেশ) শ্রবণ করা ও আনুগত্য করা অবশ্য কর্তব্য, চাই তা তার পছন্দ হোক বা অপছন্দ হোক, যতক্ষণ পর্যন্ত না পাপাচারের আদেশ দেয়া হয়। পাপাচারের আদেশ দেয়া হলে তা শ্রবণ করা ও আনুগত্য করার কোনও অবকাশ নেই।  (বুখারী, মুসলিম)


৬৬৪. ইবনে উমার (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা যখন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট শ্রবণ করা ও আনুগত্য করার উপর বাইয়াত (শপথ) করতাম, তখন তিনি আমাদের বলতেনঃ যথাসাধ্য তোমাদের আনুগত্য ফরয। (বুখারী, মুসলিম)


৬৬৫. ইবনে উমার (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছিঃ যে ব্যক্তি আনুগত্যের হাত গুটিয়ে নেয়, কিয়ামাতের দিন সে আল্লাহর সাথে এরূপ অবস্থায় মিলিত হবে যে, তার পক্ষে কোন যুক্তি থাকবে না। যে লোক এরূপ অবস্থায় মারা যাবে যে, তার ঘাড়ে আনুগত্যের বন্ধন নেই, তার মৃত্যু হবে জাহিলিয়াতের মৃত্যু।

ইয়াম মুসলিম এটি বর্ণনা করেছেন। তার অপর বর্ণনায় রয়েছেঃ যে ব্যক্তি জামা’আত থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় মারা যাবে তার মৃত্যু হবে জাহিলিয়াতের মৃত্যু।


৬৬৬. আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ তোমরা শ্রবণ কর ও আনুগত্য কর, যদিও আঙ্গুরের মত (ক্ষুদ্র) মাথাবিশিষ্ট কোন হাবশী গোলামকে তোমাদের শাসক নিয়োগ করা হয়। (বুখারী)


৬৬৭. আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ সুদিনে ও দুর্দিনে, সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টি এবং তোমার অধিকার খর্ব হওয়ার ক্ষেত্রেও (বা তোমার উপর অন্যকে অগ্রাধিকার দেয়া হলেও, শাসকের নির্দেশ) শ্রবণ করা ও আনুগত্য করা তোমার জন্য অপরিহার্য। (মুসলিম)


৬৬৮. আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা এক সফরে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে ছিলাম। আমরা এক জায়গায় যাত্রাবিরতি করলাম। আমাদের কেউ তার তাবু ঠিকঠাক করছিলাম, কেউ বা তীর নিক্ষেপ প্রতিযোগিতা করছিল, কেউ তার চতুষ্পদ জন্তুর দেখাশুনায় ব্যস্ত ছিল। এমন সময় রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ঘোষক ডেকে বলেন, নামাযের জন্য জমায়েত হন। আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট সমবেত হলাম। তিনি বলেনঃ আমার পূর্বে যেকোন নবীই অতিক্রান্ত হয়েছেন তাঁর জ্ঞান অনুযায়ী নিজের উম্মাতকে কল্যাণের পথ প্রদর্শন করা এবং যা তাঁর দৃষ্টিতে মন্দ বা অন্যায় তা থেকে তাদের সতর্ক করা ছিল তাঁর অপরিহার্য কর্তব্য। আর তোমাদের এ উম্মাতের অবস্থা এই যে, এ উম্মাতের প্রথম দিকে রয়েছে শান্তি ও সুস্থিরতা এবং শেষ দিকে রয়েছে বিপদ-মুসিবাতের ঘনঘটা। তখন তোমরা এমন সব বিষয় ও ঘটনাবলীর সম্মুখীন হবে যা হবে তোমাদের অপছন্দনীয়। এমন সব ফিতনার উদ্ভব হবে যার একাংশ অপর অংশকে করবে দুর্বল (আগেরটির তুলনায় পরেরটি হবে আরো ভয়াবহ)।  একেকটি মুসিবত আসবে আর মু’মিন বলবে এটাই বুঝি আমাকে ধ্বংস করে ছাড়বে। তারপর সে বিপদ কেটে যাবে। পুনরায় বিপদ-মুসিবত আসবে। তখন মু’মিন বলবে, এটাই হয়তো আমার ধ্বংসের কারণ হবে। এহেন কঠিন মুহূর্তে যে ব্যক্তি জাহান্নামের আগুন থেকে দূরে থাকতে এবং জান্নাতে প্রবেশ করতে ইচ্ছুক তার জন্য অপরিহার্য হল আল্লাহ ও পরকালের উপর ঈমানদার হিসেবে মৃত্যুবরণ করা। আর যেরূপ ব্যবহার সে পেতে আগ্রহী সেরূপ ব্যবহারই যেন লোকদের সাথে করে। কেউ যদি ইমামের নিকট বাইয়াত করে, তার হতে হাত রাখে এবং তার নিকট অন্তরের অর্ঘ নিবেদন করে তাহলে যেন যথাসাধ্য তার আনুগত্য করে। যদি অপর কোন লোক ইমামের মোকাবেলায় আত্মপ্রকাশ করে, তাহলে তোমরা তার ঘাড় মটকে দেবে।  (মুসলিম)


৬৬৯. আবু হুনাইদা ওয়ায়েল ইবনে হুজর (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, সালামা ইবনে ইয়াযীদ আল-জুফী (রা) রাসূলুল্লাহ (সা) কে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর নবী! আমাদের উপর যদি এরূপ শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতাশীন হয় যারা তাদের অধিকার আমাদের নিকট থেকে পুরোপুরি আদায় করে নেয়, কিন্তু আমাদের প্রাপ্য অধিকার দেয় না, তখন আমাদের জন্য আপনার নির্দেশ কি? রাসূলুল্লাহ (সা) তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। সালামা পুনরায় জিজ্ঞেস করলে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ তোমরা শ্রবণ করবে ও আনুগত্য করে যাবে। কারণ তাদের (পাপের) বোঝা তাদের উপর, তোমাদের বোঝা তোমাদের উপর।  (মুসলিম)


৬৭০. আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ আমার পরে তোমরা অধিকার হরণ ও বহু অপছন্দনীয় জিনিসের সম্মুখীন হবে। সাহাবীগণ বলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এরূপ পরিস্থিতির সম্মুখীন হবে তার জন্য আপনার নির্দেশ কি? তিনি বলেনঃ এরূপ অবস্থায় তোমরা তোমাদের নিকট প্রাপ্য যথারীতি পরিশোধ করবে এবং তোমাদের প্রাপ্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করবে। (বুখারী, মুসলিম)


৬৭১. আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল, সে আল্লাহর আনুগত্য করল। যে আমার অবাধ্যতা করল সে আল্লাহর অবাধ্যতা করল। অনুরূপ যে আমীরের আনুগত্য করল সে আমারই আনুগত্য করল এবং যে আমীরের অবাধ্যতা করল সে আমারই অবাধ্যতা করল। (বুখারী, মুসলিম)


৬৭২. ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ তোমাদের কেউ যদি তার নেতার মধ্যে কোন অপ্রীতিকর কিছু লক্ষ্য করে, তাহলে সে যেন ধৈর্যধারণ করে। কারণ যে ইসলামী রাষ্ট্রশক্তি থেকে এক বিঘত পরিমাণ দূরে সরে গিয়ে মারা যায়, সে জাহিলিয়াতের মৃত্যুবরণ করে। (বুখারী, মুসলিম)


৬৭৩. আবু বাকরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছিঃ যে ইসলামী রাষ্ট্রের প্রধানকে লাঞ্ছিত করবে, আল্লাহও তাকে লাঞ্ছিত করবেন।

ইমাম তিরমিযী এটি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন এটি হাসান হাদীস।


 

Was this article helpful?

Related Articles

Leave A Comment?