লোকদের মাঝে সমঝোতা স্থাপন করে দেয়ার বিবরণ

লোকদের পরস্পরের মধ্যে সমঝোতা স্থাপন

মহান আল্লাহ বলেনঃ

‘লোকদের গোপন সলা-পরামর্শে প্রায়শ কোন কল্যাণ নিহিত থাকে না। তবে কেউ যদি গোপনে কাউকে দান-খয়রাত করার জন্য উপদেশ দেয় অথবা কোন (ভালো) কাজের জন্য কিংবা লোকদের পারস্পরিক কাজকর্ম সংশোধনের জন্য কাউকে করবে, কিছু বলে, তবে তা নিশ্চয়ই ভালো কথা। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য যে কেউ এরূপ তাকে আমরা বিরাট প্রতিদান দেব।’  (সূরা আন নিসাঃ ১১৪)

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ

সন্ধি সর্বাবস্থায়ই উত্তম।  (সূরা আন নিসাঃ ১২৮)

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ

‘তোমার আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্ক শুধরে নাও।’  (সূরা আন ফালঃ ১)

মহান আল্লাহ আরো বলেনঃ

‘মুমিনরা পরস্পর ভাই। কাজেই তোমাদের ভাইদের পারস্পরিক সম্পর্ক যথোচিতভাবে বিন্যাস্ত করে নাও।’  (সূরা আল-হুজরাতঃ ১০)

 

২৪৮. হযরত আবু হুরাইরা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লাম বলেনঃ প্রতিদিনই মানব দেহের প্রতিটি গ্রন্থির (গিরা) সাদকা আদায় করা দরকার। (তা আদায় করার নিয়ম হলোঃ) দুই ব্যক্তির মধ্যে ইনসাফের সাথে সমঝোতা স্থাপন করে দেয়া সাদকা হিসেবে গণ্য। কোন ব্যক্তির সওয়ারীতে অপর ব্যক্তিকে আরোহন করতে দেয়া কিংবা তার মালপত্র ঐ ব্যক্তির সওয়ারীর পিঠে রাখতে দেয়া সাদকার অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র, পরিচ্ছন্ন ও উত্তম কথাবার্তা বলা সাদকা হিসেবে গণ্য। রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলাও সাদকার অন্তর্ভুক্ত।  (বুখারী ও মুসলিম)


২৪৯. হযরত উম্মে কুলসুম বর্ণনা করেন, আমি রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ কল্যাণ লাভের উদ্দেশ্যে যে ব্যক্তি মিথ্যা বলে পরস্পর বিরোধী দু’ব্যক্তির মধ্যে বন্ধুত্ব স্থাপন করে দেয়, সে মিথ্যাবাদী নয়।  (বুখারী ও মুসলিম)

মুসলিমের অপর এক বর্ণনায় রয়েছেঃ উম্মে কুলসুম আরো বলেনঃ আমি মহানবীকে মাত্র তিনটি ক্ষেত্রে ‘মিথ্যা’ বলার অনুমতি দিতে শুনেছি। (১) দুই বিবাদমান দলের মধ্যে ‘মিথ্যা’ বলার মাধ্যমে মৈত্রী স্থাপন করে দেয়া, (২) যুদ্ধের ব্যাপারে মিথ্যার আশ্রয় নেয়া (তথ্য গোপন করা) (৩) স্বামী-স্ত্রীর একান্ত কথা-বার্তায় মিথ্যার আশ্রয় নেয়া।


২৫০. হযরত আয়েশা (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা তাঁর ঘরের (দরজায়) বাইরে তর্কা-তর্কির শব্দ শুনতে পেলেন। সংশ্লিষ্ট লোকদের কণ্ঠস্বর একদম চরমে উঠেছিল। তাদের একজন ছিল ঋণগ্রহণকারী; সে ঋণের কিছু অংশ মওকুফ করার এবং তার প্রতি সদয় হওয়ার জন্য অনুনয় বিনয় করছিল। অন্যদিকে ঋণদাতা আল্লাহর নামে শপথ করে বলছিলঃ আমি তা করতে পারবো না। রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছে এসে বললেনঃ আল্লাহর নামে হলফকারী কে, যে কল্যাণের কথা বলতে রাজী নয়? লোকটি বললোঃ ‘আমি, হে আল্লাহর রাসূল’! ঋণ গ্রহীতা যেমন পছন্দ করবে, তেমনি করা হবে। (অর্থ্যাৎ সে যা বলবে, তা-ই আমি মেনে নেবো)। (বুখারী ও মুসলিম)


২৫১.  হযরত আবু সাহ্‌ল ইবনে সা’দ আস্‌-সাঈদী (রা) বর্ণনা করেনঃ রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে খবর পৌঁছল, ‘আওফ ইবনে আমর গোত্রের লোকদের মধ্যে প্রচণ্ড ঝগড়া-বিবাদ চলছে। খবর শুনে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতিপয় সাহাবীকে নিয়ে তাদের বিরোধ নিস্পত্তির জন্য সেখানে গেলেন। সেখানে তাঁর অনেক বিলম্ব হয়ে গেল। এদিকে নামাযের সময়ও ঘনিয়ে এল। হযরত বিলাল (রা) হযরত আবু বকর (রা)-এর কাছে এসে বললেনঃ হে আবু বকর! রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তো ফিরতে দেরি হয়ে যাচ্ছে। এদিকে নামাযের সময়ও হয়ে গেল। আপনি কি লোকদের নামাযে ইমামতিটা করবেন? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ, তা করতে পারি, যদি তুমি চাও! বিলাল নামাযের জন্য ইকামত দিলেন এবং আবু বকর (ইমামতির জন্যে) সামনে এগিয়ে গেলেন। তিনি তাকবীরে তাহরিমা বলে হাত বাঁধলেন এবং পিছনের মুক্তাদীরাও তাঁর অনুসরণ করলেন। ঠিক এ সময় রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসে পড়লেন। তিনি কাতার ভেদ করে একেবারে সামনের সারিতে গিয়ে দাঁড়ালেন। মুক্তাদীরা তালি বাজিয়ে তাঁর আগমনের সংকেত দিতে লাগলেন। কিন্তু আবু বকর (রা)-এর সেদিকে কোন খেয়াল ছিল না। কিন্তু তারা যখন অধিকতর জোরে তালি বাজাতে লাগলেন, তখন আবু বকর (রা) চোখ ফিরিয়ে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দেখতে পেলেন। তিনি ইঙ্গিত করে তাঁকে (আবু বকরকে) নিজ স্থানে থাকতে বললেন। কিন্তু আবু বকর (রা) নিজেই দু’হাত উঁচু করে আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং পায়ের গোড়ালী ঘুরিয়ে প্রথম কাতারে এসে দাঁড়ালেন। এরপর রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামনে গিয়ে লোকদের নামায পড়ালেন। নামায শেষে তিনি সাহাবীদের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বললেনঃ ‘হে লোকসকল! তোমাদের কি হলো! যখন নামাযের মধ্যে কোন কিছু ঘটে, তখন তোমরা (উরুতে হাত মেরে) তালি বাজাতে শুরু করো। কিন্তু উরুতে হাত মেরে তালি বাজানো তো মেয়েদের কাজ (এটা পুরুষদের জন্য উচিত নয়)।   কাজেই যে ব্যক্তি নামাযের মধ্যে কিছু ঘটতে দেখবে সে যেন ‘সুবহানাল্লাহ’ (আল্লাহ অতি পবিত্র শব্দটি উচ্চারন করে। কেননা কোন ব্যক্তি যখনই ‘সুবহানাল্লাহ’ বলে তা শোনামাত্র লোকেরা তার প্রতি মনযোগী হয়। হে আবু বকর! আমি ইঙ্গিত করা সত্ত্বেও কোন্‌ জিনিসটি তোমাকে লোকদের নামাযে ইমামতি করতে বাধা দিল? আবু বকর (রা) বললেনঃ খোদ রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপস্থিতিতে আবু কুহাফার পুত্র (আবু বকর) লোকদের নামাযে ইমামতি করার মোটেই যোগ্য নয়। (বুখারী ও মুসলিম)


 

Was this article helpful?

Related Articles

Leave A Comment?