ক্ষুধার্ত থাকা, অনাসক্তির জীবন-যাপন, খাদ্য, পানীয় ও পোশাক ইত্যাদিতে অল্পে তুষ্টি এবং আসক্তি পরিত্যাগ সংক্রান্ত ফযীলত এর বর্ণনা

[Note: এ অধ্যায়ের কুরআনের আয়াত গুলো পরে আপডেট করা হবে]

 

৪৯১. আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, মুহাম্মদ (সা)-এর ইন্তিকালের পূর্ব পর্যন্ত তাঁর পরিবার কোন দিন একনাগাড়ে দু’দিন পেটপুরে যবের রুটিও খেতে পায়নি। (বুখারী, মুসলিম)

অপর বর্ণনায় আছেঃ মুহাম্মদ (সা) মদিনা আসার পর থেকে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর পরিবারের লোকজন একনাগাড়ে তিন দিন পেট ভরে গমের রুটিও খেতে পায়নি।


৪৯২. উরওয়া (র) থেকে বর্ণিত। আয়িশা (রা) বলতেন, আল্লাহর শপথ! হে ভাগ্নে! আমরা একটা নতুন চাঁদ দেখতাম, তারপর আর একটা নতুন চাঁদ দেখতাম, তারপর আর একটা নতুন চাঁদ দেখতাম, এভাবে দু’মাসে তিন তিনটা নতুন চাঁদ দেখতাম। অথচ এ দীর্ঘ সময়ে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কোন ঘরের চুলায় আগুন জ্বলত না। আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে খালাম্মা! তাহলে আপনারা কি খেয়ে জীবন-যাপন করতেন? তিনি বলেন, দু’টি কালো বস্তু, অর্থাৎ খেজুর ও পানি (পান করে কাটাতাম)।  তবে হ্যাঁ, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কয়েকজন আনসার প্রতিবেশী ছিলেন। তাদের কাছে দুগ্ধবতী উটনী ছিল। তারা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে কিছু দুধ পাঠাতেন এবং তিনি তা আমাদের পান করাতেন। (বুখারী, মুসলিম)


৪৯৩. আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি একটি দলের নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাদের সামনে তখন তাজা একটি আস্ত বকরী ছিল। তারা তাকে দাওয়াত করলে তিনি তা খেতে অস্বীকার করেন এবং বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন, অথচ তিনি কখনো পেট ভরে যবের রুটিও খেতে পাননি। (বুখারী)


৪৯৪. আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ইন্তিকালের পূর্ব পর্যন্ত নবী (সা) কখনো রকমারি খাদ্যের দস্তরখানে আহার করেননি এবং তিনি কখনো মিহি রুটিও খাননি।

ইমাম বুখারী এটি রিওয়ায়াত করেছেন। অন্য বর্ণনায় আছেঃ তিনি স্বচক্ষে কখনো আস্ত ভাজা বকরীও দেখেননি।


৪৯৫. নু’মান ইবনে বাশীর (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি তোমাদের নবী (সা) কে দেখেছি, তিনি তাঁর পেট ভরার জন্য রদ্দি খেজুরও পেতেন না। (মুসলিম)


৪৯৬. সাহল ইবনে সা’দ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহ তা’আলা রাসূলুল্লাহ (সা) কে মানবজাতির জন্য নবী বানিয়ে পাঠানোর পর থেকে তাঁকে তুলে নেয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি কখনো মিহি আটার রুটি দেখেননি। তাকে জিজ্ঞেস করা হল, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর যুগে কি আপনাদের কাছে চালুনি ছিলো না? তিনি বলেন, আল্লাহ তা’আলা রাসূলুল্লাহ (সা) কে মানবজাতির জন্য নবী বানিয়ে পাঠানোর পর থেকে তাঁকে ওফাতের মাধ্যমে উঠিয়ে নেয়ার পূর্ব পর্যন্ত তিনি কখনো চালুনি দেখেননি। তাকে আবার জিজ্ঞেস করা হল, তাহলে আপনারা না ঝাড়া যব খেতেন কিরূপে? তিনি বলেন, আমরা তা পিষে তাতে ফুঁ দিতাম, যা কিছু উড়ে যাওয়ার উড়ে যেতো, অতঃপর অবশিষ্ট আটা বা ময়দা পানি মিশিয়ে খামীর বানাতাম। (বুখারী)


৪৯৭. আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা দিনে অথবা রাতে রাসূলুল্লাহ (সা) বাড়ীর বাইরে বের হতেই আবু বকর ও উমার (রা)-এর সাথে তাঁর সাক্ষাত হয়। তিনি তাঁদের জিজ্ঞেস করলেনঃ এ মুহূর্তে কোন জিনিস তোমাদের বাড়ির বাইরে বের করে এনেছে? তারা বলেন, ক্ষুধার জ্বালা, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বলেনঃ যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ! যে জিনিসটা তোমাদের ঘরের বাইরে এনেছে, সেটি আমাকেও বের করে ছেড়েছে। তোমরা উঠো। সুতরাং তারা দু’জন তাঁর সাথে উঠলেন। এরপর তাঁরা (চলতে চলতে) এক আনসারীর বাড়িতে এসে উপস্থিত হন। দেখা গেলো, তিনি বাড়ি নেই। তাঁর স্ত্রী তাঁকে দেখতে পেয়ে বলেনঃ মারহাবা, স্বাগতম! তিনি (নবী সা.) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ অমুক কোথায়? তিনি বললেন উনি আমাদের জন্য মিষ্টি পানি আনতে গেছেন। ইতিমধ্যে আনসারী এসে রাসুলল্লাহ (সা) ও তাঁর সাথীদ্বয়কে দেখে বলেন আলহামদুলিল্লাহ, আজ কারো কাছে আমার মেহমানের চেয়ে সম্মানিত মেহমান উপস্থিত নেই। অতঃপর তিনি বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন এবং পাকা তাজা- খেজুরের একটি গুচ্ছ এনে তাঁদের সামনে রেখে বলেন, এগুলো খেতে থাকুন। অতঃপর তিনি একটি ছুরি নিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁকে বলেনঃ সাবধান! দুগ্ধবতী বকরী যবেহ করবে না। অতঃপর তিনি তাঁদের জন্য একটি বকরী যবেহ করে নিয়ে এলেন। তাঁরা সে বকরী থেকে ও খেজুর গুচ্ছ থেকে খেলেন এবং পানি পান করলেন। সকলেই যখন পেট ভরে খেলেন ও তৃপ্তি সহকারে পান করলেন তখন রাসূলুল্লাহ (সা) আবু বক্‌র ও উমারকে বলেনঃ যাঁর হাতে আমার প্রাণ তাঁর শপথ! কিয়ামতের দিন তোমাদের এ নিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। ক্ষুধা তোমাদের বাড়ি থেকে বের করেছে, অতঃপর এ নিয়ামাত পেয়ে তোমরা বাড়ি ফিরছো।৬৩ (মুসলিম)

*৬৩. রাসুলুল্লাহ (সা) ও তাঁর দুই সাথী যে মহান আনসারী সাহাবীর ঘরে গিয়েছিলেন তিনি হচ্ছেন হযরত আবুল হাইসাম ইবনুত তায়্যিহান (রা)।   ইমাম তিরমিযী তাঁর হাদীস গ্রন্থে এই সাহাবীর নাম উল্লেখ করেছেন।


৪৯৮. খালিদ ইবনে উমার আল-আদাবী (র) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, বসরার গভর্ণর উতবা ইবনে গাযওয়ান (রা) আমাদের সামনে ভাষণ দেন। তিনি হাম্‌দ ও সানা পাঠ করার পর বলেন, দুনিয়া তো ধ্বংসের ঘোষণা দিচ্ছে এবং খুব দ্রুত পালাচ্ছে। আর পানি পান করার পর পাত্রের তলদেশে যেটুকু পানি অবশিষ্ট থাকে দুনিয়াটা শুধু ততটুকুই অবশিষ্ট আছে। আর দুনিয়াদাররা তা থেকেই পান করছে। তোমাদেরকে এই অস্থায়ী জগত ত্যাগ করে এক স্থায়ী জগতের দিকে পাড়ি জমাতে হবে। সুতরাং তোমাদের কাছে যে উত্তম জিনিস আছে তা সাথে নিয়ে যাও। আমার নিকট বর্ণনা করা হয়েছে যে, জাহান্নামের এক পার্শ্ব থেকে একটি পাথর নিক্ষেপ করা হবে এবং তা সত্তর বছর পর্যন্ত এর গভীরে নিচের দিকে পতিত হতে থাকবে, তবুও এটা গর্তের তলদেশে পৌঁছতে পারবে না। আল্লাহর শপথ! তবু এটা পূর্ণ করা হবে। তোমরা কি বিস্মিত হচ্ছো? আমাদের নিকট বর্ণনা করা হয়েছে যে, জান্নাতের দরজাসমূহের দুই কপাটের মধ্যখান চল্লিশ বছরের দূরত্বের সমান প্রশস্ত। অথচ এমন একটি দিন আসবে, যখন তা ভীড়ে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে। আমি নিজেকে রাসুল (সা)-এর সাথে সাত ব্যক্তির মধ্যে সপ্তমজন হিসাবে দেখেছি। গাছের পাতা ছাড়া আমাদের কাছে আর কোন খাদ্যই ছিলো না। তা খেতে খেতে আমাদের চোয়ালে ঘা হয়ে গিয়েছিলো। আমি একটি চাদর পেয়েছিলাম। তা দুই টুকরা করে ফেড়ে আমি ও সা’দ ইবনে মালিক (রা) ভাগ করে নিলাম। এর অর্ধেকটা দিয়ে আমি লুঙ্গি বানালাম এবং বাকি অর্ধেকটা দিয়ে সা’দ লুঙ্গি বানালেন। কিন্তু বর্তমানের অবস্থা এই যে, আমাদের প্রায় (সাতজনের) প্রত্যেকেই কোন না কোন শহরে (প্রদেশের) গভর্নর হয়েছেন। আমি নিজের কাছে বড় হওয়া ও আল্লাহর কাছে ছোট হওয়া থেকে মহান আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করি। (মুসলিম)


৪৯৯. আবু মুসা আশআরী (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আয়িশা (রা) আমাদের সামনে একটি চাদর ও একটি মোটা লুঙ্গি বের করে এনে বললেন, এ দু’টি পরিহিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সা) ইন্তিকাল করেন। (বুখারী, মুসলিম)

৫০০. সা’দ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমিই ছিলাম আল্লাহর পথে তীর নিক্ষেপকারী সর্বপ্রথম আরব। আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে জিহাদে অংশগ্রহণ করেছি। আমাদের কাছে বাবলা এবং এই ঝাও গাছের পাতা ছাড়া আর কোন খাদ্যই ছিল না, এমনকি আমাদের লোকেরা ছাগলের বিষ্ঠার ন্যায় পায়খানা করতো, একটা আরেকটার সাথে মিশতো না। (বুখারী, মুসলিম)


৫০১. আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ হে আল্লাহ! মুহাম্মদ (সা)-এর পরিবারকে জীবন ধারণ উপযোগী নূন্যতম রিযিক দান করুন। (বুখারী, মুসলিম)


৫০২. আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ, যিনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই! রাসূলুল্লাহ (সা)-এর যুগে ক্ষুধার কারণে আমি আমার পেট মাটির সাথে লাগিয়ে রাখতাম, আবার কখনো ক্ষুধার জ্বালায় আমার পেটে পাথর বেঁধে রাখতাম। একদিন আমি লোক চলাচলের পথের উপর বসে থাকলাম। রাসূলুল্লাহ (সা) সে পথে আমার নিকট দিয়ে যাওয়ার সময় আমাকে দেখে মুসকি হাসলেন এবং আমার মুখমণ্ডলের অবস্থা ও অন্তরের কথা বুঝে ফেললেন। অতঃপর তিনি বলেনঃ হে আবু হুরাইরা! আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি আপনার খেদমতে উপস্থিত। তিনি বলেনঃ আমার সাথে এসো। তিনি রওয়ানা দিলেন। আমিও তাঁর পিছে পিছে গেলাম। অতঃপর তিনি অনুমতি নিয়ে বাড়ি প্রবেশ করলে আমিও প্রবেশ করলাম। তিনি এক পেয়ালা দুধ দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেনঃ এ দুধ কোত্থেকে এসেছে? পরিবারের লোকেরা বললো, অমুক ব্যক্তি বা অমুক মেয়েলোক আপনার জন্য হাদিয়া পাঠিয়েছেন।

তিনি বলেনঃ হে আবু হুরাইরা! আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার খেদমতে হাযির। তিনি বলেনঃ যাও আসহাবে সুফফাদের ডেকে নিয়ে এসো। আবু হুরাইরা (রা) বলেন, আসহাবে সুফফা হল ইসলামের মেহমান। তাদের বাড়ি-ঘর, পরিবার-পরিজন, ধন-সম্পদ কিছুই ছিল না। এমন কোন বন্ধু বান্ধবও তাদের ছিল না যাদের বাড়িতে গিয়ে তারা থাকতে পারতো। তাঁর (রাসূলের) কাছে সদকার মাল আসলে তা তিনি তাদের কাছে পাঠিয়ে দিতেন, তিনি তাতে হাত দিতেন না। আর যখন হাদিয়া বা উপহার আসতো, তখন তিনি তাদের কাছে কিছু পাঠিয়ে দিতেন এবং নিজেও তা থেকে গ্রহণ করতেন। সেদিন তিনি আমাকে তাদের ডেকে আনার কথা বলাতে আমার খুব খারাপ লাগলো। আমি মনে মনে বললাম, আসহাবে সুফফার এইটুকু দুধে কি হবে? আমি তো বেশি হকদার ছিলাম, এ দুধের কিছু পান করে শক্তি অনুভব করতাম। আর তারা যখন আসবে, তাদেরকে এ দুধ পরিবেশন করার জন্য তিনি তো আমাকেই আদেশ দিবেন। তাদের সবাইকে দেয়ার পর এ থেকে আমি কিছু পাব বলে তো মনে হচ্ছে না। অথচ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা)-এর আদেশ মান্য করা ছাড়া কোন উপায়ও ছিল না। কাজেই আমি তাদের কাছে গিয়ে তাদের ডাকলাম। তারা এসে ভেতরে প্রবেশ করার অনুমতি চাইলে তিনি তাদের অনুমতি দিলেন। তারা ঘরের ভেতরে নিজ নিজ জায়গায় বসে পড়লেন। তিনি (নবী সা.) আমাকে বলেনঃ হে আবু হুরাইরা! আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি আপনার কাছেই উপস্থিত। তিনি বলেনঃ দুধের পেয়ালাটি নিয়ে তাদের পরিবেশন কর। তিনি (আবু হুরাইরা) বলেন, আমি পেয়ালা নিয়ে একজনকে দিলাম। তিনি তৃপ্তির সাথে পান করে আমাকে পেয়ালা ফেরত দিলেন। অতঃপর আমি আরেকজনকে দিলাম, তিনিও পূর্ণ তৃপ্তির সাথে পান করে আমাকে পেয়ালাটা ফেরত দিলেন। এভাবে সবার শেষে আমি নবী (সা)-এর কাছে পেয়ালা নিয়ে হাযির হলাম। অথচ উপস্থিত সকলেই তৃপ্তির সাথে তা পান করেছেন। তিনি পেয়ালাটা নিয়ে নিজের হাতে রেখে মুচকি হেসে বলেনঃ হে আবু হুরাইরা! আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমি আপনার খেদমতে হাযির। তিনি বলেনঃ আমি আর তুমি বাকি রয়ে গেছি। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি সত্যই বলেছেন। তিনি বলেনঃ বসো এবং (দুধ) পান কর। অতএব আমি বসে তা পান করলাম। আবার তিনি বললেনঃ পান কর। আমি পান করলাম। এভাবে তিনি আমাকে পান করার কথা বলতেই থাকলেন। অবশেষে আমি বললাম, না আর পারব না। সেই সত্তার কসম, যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন! এর জন্য আমার পেটে আর খালি জায়গা নেই। তিনি বলেনঃ আমাকে এবার তৃপ্ত কর। আমি তাঁকে পেয়ালা দিলে তিনি আল্লাহর প্রশংসা করলেন এবং বিসমিল্লাহ বলে অবশিষ্ট দুধ পান করলেন। (বুখারী)


৫০৩. আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নিজেকে এমন অবস্থায়ও দেখেছি যে, যখন আমি ক্ষুধার তাড়নায় বেহুঁশ হয়ে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মিম্বার ও আয়িশা (রা)-এর কক্ষের মাঝখানে পড়ে থাকতাম। কেউ কেউ এসে আমাকে পাগল মনে করে আমার ঘাড় পদদলিত করতো। অথচ আমার মধ্যে পাগলামি ছিল না, বরং ছিল ক্ষুধার তীব্রতা। (বুখারী)


৫০৪. আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ওফাতের সময় অবস্থা এমন ছিল যে, তাঁর বর্মটি জনৈক ইহূদীর কাছে ত্রিশ সা’ যবের বিনিময় বন্ধক রাখা ছিল।* (বুখারী, মুসলিম)

* এক সা –এর ওজন প্রায় তিন সের সাড়ে বার ছটাক।


৫০৫. আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী (সা) তাঁর বর্মটি কিছু যবের বিনিময়ে বন্ধক রেখেছিলেন। আমি নবী (সা)-এর কাছে যবের রুটি এবং দুর্গন্ধযুক্ত ময়দার রুটি নিয়ে গিয়েছিলাম। (অধস্তন রাবী) আমি আনাস (রা)-কে বলতে শুনেছি, মুহাম্মাদ (সা) -এর পরিবারের জন্য সকাল-সন্ধ্যায় এক সা’ গমও মিলতো না, অথচ তাঁরা নয় ঘর ছিলেন। (বুখারী)


৫০৬. আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি অবশ্যি সত্তরজন এমন আসহাবে সুফফাকে দেখেছি, যাদের কারো কাছেই কোন চাদর ছিল না। কারো কাছে হয়তো একটি লুঙ্গি ছিল, আবার কারো কাছে ছিল একটি কম্বল। আর তাঁরা তাদের কাঁধের সাথে বেঁধে রাখতেন। তাঁদের মধ্যে কারো লুঙ্গি পায়ের দু’গোছা পর্যন্ত পড়তো, কারোটা দু’হাঁটু পর্যন্ত। লজ্জাস্থান উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ার ভয়ে তাঁরা লুঙ্গী হাতে ধরে রাখতেন। (বুখারী)


৫০৭. আয়িশা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চামড়ার একটি বিছানা ছিল, এর ভেতরে ভরা ছিল খেজুরের ছাল। (বুখারী)


৫০৮. ইবনে উমার (রা) থেকে বর্ণিত। আমরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাথে বসা ছিলাম। এমন সময় জনৈক আনসারী এসে তাঁকে সালাম দিলেন, অতঃপর ফিরে যেতে রওয়ানা হলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে জিজ্ঞেস করলেনঃ হে আনসারী ভাই! আমার ভাই সা’দ ইবনে উবাদা কেমন আছে? তিনি বলেন, ভালোই আছেন। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা) জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমাদের মধ্যে কে তাঁকে দেখতে যাবে? তিনি উঠে রওয়ানা দিলেন। আমরাও তাঁর সাথে চললাম। আমরা ছিলাম সংখ্যায় দশের চেয়ে কিছু বেশি। কিন্তু আমাদের কারো পরিধানে জুতা, মোজা, টুপি এবং জামা ছিল না। এমতাবস্থায় অনাবাদী প্রান্তর পেরিয়ে তাঁর কাছে এসে পৌঁছলাম। তাঁর (সা’দের) চারপাশ থেকে তাঁর গোত্রের লোকেরা সরে গেলো এবং রাসূলুল্লাহ (সা) ও তাঁর সাথীরা তাঁর নিকটবর্তী হলেন। (মুসলিম)


৫০৯. ইমরান ইবনে হুসাইন (রা) থেকে বর্ণিত। নবী (সা) বলেনঃ আমার যুগের লোকেরাই (সাহাবীরা) তোমাদের সবচাইতে উত্তম, অতঃপর যারা এর পরবতী যুগে আসবে (তাবিঈন), এরপর যারা তাদের পরবর্তী যুগে আসবে (তাবে তাবেঈন, পর্যায়ক্রমে তারাই উত্তম লোক)।   ইমরান (রা) বলেন, এটা আমার স্মরণ নেই যে, নবী (সা) এ কথা দু’বার বলেছেন নাকি তিনবার? তাদের পরে এমন এক জাতির উদ্ভব হবে, যারা সাক্ষ্য দিবে কিন্তু তাদের কাছে সাক্ষ্য চাওয়া হবে না। তারা খিয়ানত করবে, আমানতদারি করবে না; অঙ্গীকার (মানত) করবে, কিন্তু পূর্ণ করবে না এবং তাদের শরীরে মেদ পরিলক্ষিত হবে। (বুখারী, মুসলিম)


৫১০. আবু উমামা (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ হে আদম সন্তান! তুমি যদি তোমার প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ সৎ কাজে ব্যয় কর, তাহলে তোমার কল্যাণ হবে, আর যদি তা আটকে রাখ, তাহলে তোমার অমঙ্গল হবে। তবে তোমার প্রয়োজন পরিমাণ সম্পদ রেখে দিলে তুমি তিরস্কৃত হবে না। সর্বপ্রথম তোমার পোষ্যদের থেকে ব্যয় করা শুরু কর।

ইমাম তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনা করে বলেন, হাদীসটি হাসান ও সহীহ।


৫১১. উবাইদুল্লাহ ইবনে মিহসান আল-আনসারী আল-খাতমী (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেনঃ তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি শারীরিক নিরাপদ অবস্থায় ও সুস্থ দেহে সকালে উপনীত হলো এবং তার কাছে ক্ষুধা নিবারণের মত ঐ দিনের খোরাক আছে, তাকে যেন দুনিয়ার যাবতীয় কিছুই দান করা হয়েছে।

ইমাম তিরমিযী এটি বর্ণনা করে বলেন, হাদীসটি হাসান।


৫১২. আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল ‘আস (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ সেই ব্যক্তি সফলকাম হয়েছে যে ইসলাম গ্রহণ করেছে, তার কাছে প্রয়োজন পরিমাণ রিযিক আছে এবং আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তাতেই তাকে তুষ্ট রেখেছেন। (মুসলিম)


৫১৩. আবু মুহাম্মাদ ফাদালা ইবনে উবাইদ আল-আনসারী (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা) কে বলতে শুনেছেনঃ যাকে ইসলামের হেদায়েত দান করা হয়েছে, তার প্রয়োজন মাফিক জীবনোপকরণ আছে এবং তাতেই সে তুষ্ট থাকে তার জন্য সুসংবাদ।

ইমাম তিরমিযী এটি বর্ণনা করে বলেন, হাদীসটি হাসান ও সহীহ।


৫১৪. ইবনে আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) একনাগাড়ে কয়েকদিন পর্যন্ত ভুখা থাকতেন এবং তাঁর পরিবার-পরিজনের রাতের খাবার জুটতো না। প্রায়শই তাদের খাদ্য ছিল যবের রুটি। ইমাম তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনা করে বলেন, এটি হাসান ও সহীহ হাদীস।


৫১৫. ফাদালা ইবনে উবাইদ (রা) থেকে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ (সা) যখন সাহাবীদের নিয়ে নামায পড়তেন, তখন তাঁর পেছনে দাঁড়ানো আসহাবে সুফফার অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের মধ্য থেকে কতক লোক ক্ষুধার তীব্রতায় (অজ্ঞান হয়ে) মাটিতে ঢলে পড়ে যেতেন, এমনকি বেদুঈনরা তাদেরকে পাগল বলে আখ্যায়িত করতো। রাসূলু্‌ল্লাহ (সা) নামায শেষে তাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে বলতেনঃ তোমরা যদি জানতে পারতে যে, আল্লাহর কাছে তোমাদের জন্য কি মর্যাদা ও সামগ্রী মজুদ আছে, তাহলে ক্ষুধা ও অভাব আরো বৃদ্ধি হওয়ার কামনা করতে।

ইমাম তিরমিযী এটি বর্ণনা করে বলেন, হাদীসটি সহীহ।


৫১৬. আবু করীমা মিকদাদ ইবনে মা’দীকারিব (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) থেকে বলতে শুনেছিঃ কোন মানুষ পেটের চাইতে খারাপ কোন পাত্র ভর্তি করে না। মানুষের মেরুদণ্ড সোজা রাখার মত কয়েক গ্রাস খাদ্যই তার জন্য যথেষ্ট। এর চাইতেও যদি বেশি প্রয়োজন হয়, তবে পেটকে তিন ভাগে ভাগ করে এক-তৃতীয়াংশ তার খাদ্যের জন্য, এক-তৃতীয়াংশ তার পানীয়ের জন্য এবং এক-তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য ভাগ করে নেবে।

ইমাম তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনা করে বলেন, এটি হাসান হাদীস।


৫১৭. আবু উমামা ইয়াস ইবনে সালাবা আল-আনসারী আল-হারিসী (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাহাবীগণ তাঁর কাছে দুনিয়া সম্পর্কে আলোচনা করলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ তোমরা কি শুনছো না, তোমরা কি শুনছো না? আরাম-আয়েশ ও বিলাসিতা ত্যাগ করা ঈমানের লক্ষণ, আরাম-আয়েশ ও বিলাসিতা ত্যাগ করা ঈমানের নিদর্শন অর্থাৎ সাদাসিধা ও অনাড়ম্বর জীবন-যাপন। (আবু দাঊদ)


৫১৮. আবু আবদুল্লাহ জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) আবু উবাইদার (রা) –এর নেতৃত্বে আমাদেরকে কুরাইশদের একটি কাফেলার মোকাবেলা করার জন্য প্রেরণ করেন এবং আমাদের মাত্র এক বস্তা খেজুর দান করেন, এছাড়া আর কিছুই দেননি। আবু উবাইদা (রা) আমাদের একেকজনকে রোজ একটি করে খেজুর দিতেন। তাঁকে (জাবের) জিজ্ঞেস করা হল, একটি খেজুর আপনারা কি করতেন? তিনি বলেন, শিশুরা যেরূপ চোষে আমরাও সেরূপ চুষতে থাকতাম, অতঃপর পানি পান করতাম, এভাবে সারাদিনের জন্য আমাদের যথেষ্ট হয়ে যেতো। আর আমরা লাঠি দিয়ে গাছের পাতা পেড়ে পানিতে ভিজিয়ে খেতাম। তিনি (রাবী) বলেন, অতঃপর আমরা সমুদ্রের উপকূলে পৌঁছে গেলাম। হঠাৎ দেখতে পেলাম সমুদ্রের উপকূলে বিরাট টিলার মত মস্ত বড় একটি বস্তু পড়ে আছে। আমরা এর কাছে গিয়ে দেখতে পেলাম যে, ইহা বড় এক সামুদ্রিক জীব। একে আম্বর বা তিমি বলা হয়। আবু উবাইদা (রা) বলেন, এটা তো মৃত। পুনরায় তিনি বললেন, না, আমরা তো রাসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রেরিত বাহিনী এবং আল্লাহর পথের মুজাহিদ, আর তোমরা তো দুর্দশাগ্রস্ত। সুতরাং তোমরা তা খেতে পার। অতঃপর আমরা একমাস পর্যন্ত এটা খেয়েই অতিবাহিত করলাম। আমরা সংখ্যায় তিনশত লোক ছিলাম। এটা খেয়ে আমরা মোটাতাজা হয়ে গেলাম। আমরা এও দেখেছি যে, মশক ভর্তি করে এর চোখের বৃত্ত থেকে আমরা তেল বের করতাম এবং বলদের গোশতের টুকরার মত টুকরা কেটে বের করতাম। আবু উবাইদা (রা) আমাদের তেরোজনকে এর চোখের কোটরে বসিয়ে দিলেন। তিনি এর একটি পাঁজরের হাড় নিয়ে তা দাঁড় করালেন এবং আমাদের সাথের সবচেয়ে উঁচু একটি উটের উপর হাওদা রেখে এর নিচে দিয়ে চালিয়ে নিলেন। এর কিছু গোশত আমরা রসদের জন্য পাকিয়ে রেখে দিলাম। অতঃপর আমরা মদীনায় এসে রাসূলুল্লাহ (সা) এর কাছে উপস্থিত হলাম। আমরা তাঁর কাছে এ ব্যাপারে আলোচনা করলে তিনি বলেনঃ আল্লাহ তোমাদের রিযিক হিসেবে এটা দান করেছেন। তোমাদের কাছে এর গোশত থাকলে আমাদেরকে খাওয়াও। অতঃপর আমরা রাসূলুল্লাহ (সা) -এর কাছে কিছু গোশত পাঠিয়ে দিলাম এবং তিনি তা খেলেন। (মুসলিম)


৫১৯. আসমা বিনতে ইয়াযীদ (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা) -এর জামার আস্তিন ছিলো কব্জি পর্যন্ত।

ইমাম আবু দাঊদ ও তিরমিযী হাদীসটি বর্ণনা করেন এবং তিরমিযী বলেন, এটি হাসান হাদীস।


৫২০. জাবির (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, পরিখার যুদ্ধে আমরা খন্দক খনন করতে করতে একটি কঠিন পাথর বের হল। সাহাবীগণ নবী (সা) -এর কাছে গিয়ে বললেন, খন্দকে একটি পাথর বেরিয়েছে। তিনি বলেনঃ আমি নামছি, অতঃপর তিনি উঠে দাঁড়ান এবং ক্ষুধার কারণে তাঁর পেটে পাথর বাঁধা ছিল। তিন দিন পর্যন্ত আমরা কিছুই মুখে দেইনি। নবী (সা) একটি কোদাল হাতে নিয়ে পাথরে আঘাত করলেন, অমনি পাথরটি টুকরো টুকরো হয়ে বালিতে পরিণত হলো। আমি বললাম ইয়া রাসুলল্লাহ! আমাকে একটু বাড়ি যাওয়ার অনুমতি দিন। অতঃপর আমি বাড়িতে গিয়ে স্ত্রীকে বললাম, আমি নবী (সা) কে যে অবস্থায় দেখে এসেছি, তাতে আমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে। তোমার কাছে কিছু আছে কি? সে বলল, আমার কাছে কিছু যব ও একটি ছাগল ছানা আছে। আমি ছাগল ছানাটি যবেহ করলাম এবং যব পিষলাম। অতঃপর ডেকচিতে গোশত চড়িয়ে দিয়ে নবী (সা) -এর কাছে এসে উপস্থিত হলাম। ইতোমধ্যে আটা রুটি তৈরীর উপযুক্ত হয়ে গেল এবং উনুনের ডেকচিতে গোশত রান্না হয়ে গেল। আমি তাঁকে বললাম, ইয়া রাসুলাল্লাহ! অল্প কিছু খাবারের ব্যবস্থা করেছি। দয়া করে আপনি এবং সাথে এক অথবা দু’জন লোক নিয়ে চলুন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেনঃ আমরা কতোজন যাবো? আমি তাঁকে পরিমাণ খুলে বললাম। তিনি বলেনঃ আমরা বেশি সংখ্যকই উত্তম। তুমি তোমার স্ত্রীকে বলো, আমি না আসা পর্যন্ত ডেকচি নামিও না এবং উনুন থেকে রুটি বের করো না। অতঃপর তিনি সকলকে সম্বোধন করে বলেনঃ সকলেই চলো। অতএব মুহাজির ও আনসার সকলেই রওয়ানা দিলেন। আমি স্ত্রীর কাছে এসে বললাম, তোমার উপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক, নবী (সা), আনসার মুহাজির ও তাঁর সাথের সবাই এসে গেছেন। সে বলল, তিনি কি তোমাকে কিছু জিজ্ঞাসা করেছেন? আমি বললাম হ্যাঁ। অতঃপর নবী (সা) বলেনঃ তোমরা প্রবেশ করো; কিন্তু ভিড় করো না। তারপর তিনি রুটি টুকরো টুকরো করে তার উপর গোশত দিতে লাগলেন এবং ডেকচি ও উনুন ঢেকে দিলেন। তিনি তা থেকে সাহাবীদের কাছে এনে ঢেকে দিতেন। এভাবে তিনি রুটি টুকরা করতেই থাকলেন। এবং তাতে তরকারী ঢেলে দিতে থাকলেন। অবশেষে সকলেই পূর্ণ তৃপ্তি সহকারে পেট ভরে খেলেন এবং কিছু অবশিষ্টও থাকলো। তিনি বলেনঃ এগুলো তুমি (জাবিরের স্ত্রী) খাও এবং অন্যদের হাদিয়া দাও। (বুখারী, মুসলিম)

অপর বর্ণনায় আছেঃ জাবির (রা) বলেন, পরিখা খননের সময় আমি নবী (সা)-এর মধ্যে ক্ষুধার লক্ষণ দেখতে পেয়ে আমার স্ত্রীর কাছে ফিরে এলাম এবং তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কাছে কিছু আছে কি? আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে খুবই ক্ষুধার্ত দেখেছি। সে আমাকে এক সা’ যব ভর্তি একটি থলে বের করে দিল। আমাদের পালিত একটি ভেড়ার বাচ্চা ছিল, আমি তা যবেহ করলাম। সে যব পিষে ফেললো। আমি অবসর হয়ে গোশত টুকরা করে ডেকচিতে চড়িয়ে দিলাম। অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ (সা) -এর কাছে ফিরে যেতে উদ্যত হতেই সে বললো, আমাকে রাসূলুল্লাহ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের সামনে লজ্জিত করো না। আমি তাঁর কাছে হাযির হয়ে তাঁকে চুপে চুপে বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাদের একটি ভেড়ার বাচ্চা ছিল, আমি তা যবেহ করেছি এবং সে এক সা’ যব পিষে আটা তৈরি করেছে। সুতরাং দয়া করে আপনি কয়েকজন লোকসহ চলুন।

রাসূলুল্লাহ (সা) উচ্চস্বরে বললেনঃ হে খন্দক বাহিনী! জাবির তোমাদের জন্য মেহমানী (বড় খানা) প্রস্তুত করেছে, সুতরাং সবাই চল। নবী (সা) আমাকে বলেনঃ আমি না আসা পর্যন্ত উনুন থেকে ডেকচি নামিও না এবং রুটিও পাকিও না। আমি চলে আসলাম এবং নবী (সা) সবাইকে নিয়ে চলে আসলেন। আমি আমার স্ত্রীর কাছে এসে সব বললে সে বললো, তুমিই লজ্জিত হবে, তুমিই অপমানিত হবে। আমি বললাম, তুমি যা বলে দিয়েছিলে, আমি তো তাই করেছি। অতঃপর সে খামীর করা আটা বের করে দিল। তিনি (নবী) তাতে মুখের লালা মিশিয়ে বরকতের দু’আ করলেন এবং ডেকচির কাছে এসেও মুখের লালা দিয়ে দু’আ করলেন, অতঃপর বললেনঃ রাঁধুনিকে ডাক। সে তোমাদের সাথে রুটি পাকাবে এবং ডেকচি থেকে গোশত বের করবে, কিন্তু উনুন থেকে তা নামাবে না। লোকসংখ্যা ছিল এক হাজার। আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, তারা সবাই পেট ভরে খেলেন এবং অবশিষ্ট রেখে চলে গেলেন। এদিকে আমাদের ডেকচিতে জোশ মারার শব্দ হচ্ছিল এবং একইভাবে রুটিও পাকানো হচ্ছিল।


৫২১. আনাস (রা) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আবু তালহা (রা) উম্মু সুলাইম (রা)-কে বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা)-এর দুর্বল কণ্ঠস্বর শুনলাম। আমি লক্ষ্য করলাম তিনি ক্ষুধার্ত আছেন। তোমার কাছে কিছু আছে কি? তিনি বলেন, হ্যাঁ। অতঃপর তিনি কয়েক টুকরা যবের রুটি বের করে আনলেন এবং তার ওড়নার কতক অংশ দিয়ে রুটি পেঁচিয়ে দিলেন, অতঃপর পুঁটলিটি আমার কাপড়ের নীচে ঢেকে দিয়ে ওড়নার কতকাংশ আমার উপর উড়িয়ে দিলেন, অতঃপর আমাকে রাসূলুল্লাহর (সা) কাছে পাঠান। আমি তা নিয়ে উপস্থিত হয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) কে মসজিদে বসা অবস্থায় পেলাম। তাঁর সাথে আরো লোক ছিল। আমি তাদের কাছে দাঁড়ালে রাসূলুল্লাহ (সা) আমাকে বললেনঃ তোমাকে কি আবু তালহা পাঠিয়েছে? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেনঃ আহারের জন্য? আমি বললাম, হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেনঃ তোমরা উঠে চলো। সুতরাং সবাই রওয়ানা হলেন। আমিও তাদের সাথে আগে আগে এসে আবু তালহা (রা) কে অবহিত করলাম। আবু তালহা বলেনঃ হে উম্মু সুলাইম! রাসূলু্‌ল্লাহ (সা) তো সাহাবীদের নিয়ে এসে পড়েছেন, অথচ তাদের খাওয়ানোর মত কিছুই আমাদের কাছে নেই। উম্মু সুলাইম (রা) বলেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। অতঃপর আবু তালহা রাসূলুল্লাহ (সা) -এর সাথে সাক্ষাত করলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর সাথে আগমন করে বাড়িতে প্রবেশ করে ডাক দিয়ে বলেনঃ হে উম্মু সুলাইম! তোমার কাছে যা আছে নিয়ে এসো। তিনি সেই রুটিগুলো হাযির করেন। রাসূলুল্লাহ (সা) রুটিগুলো টুকরা টুকরা করতে আদেশ দিলে এগুলো টুকরা করা হলো। উম্মু সুলাইম তাতে ঘি ঢেলে তরকারি তৈরি করলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) আল্লাহর মর্জি মাফিক বরকতের দু’আ পড়লেন, অতঃপর বলেনঃ দশজনকে ভেতরে আসার অনুমতি দাও। তিনি (আবু তালহা) তাদের অনুমতি দিলেন। তারা ভেতরে এসে তৃপ্তির সাথে খেয়ে বেরিয়ে গেলেন। অতঃপর তিনি আরো দশজনকে অনুমতি দেয়ার আদেশ দিলেন এবং তিনি তাদের অনুমতি দিলে, তারাও তৃপ্তি সহকারে খেয়ে বেরিয়ে গেলেন। পুনরায় আবার দশজনের অনুমতির আদেশ দিলেন। এভাবে এ দলের সবাই পূর্ণ তৃপ্তির সাথে খেয়ে গেলেন। এ দলে সত্তরজন অথবা আশিজন লোক ছিলেন। (বুখারী, মুসলিম)

অপর বর্ণনায় আছেঃ অতঃপর দশজন করে ভেতরে আসতে থাকলেন এবং দশজন বেরিয়ে যেতে থাকলেন, এমনকি তাদের কেউ বাকি রইল না; বরং প্রত্যেকেই ভেতরে প্রবেশ করে খেয়ে বেরিয়ে গেলেন। অতঃপর বাকি খাবার একত্র করে দেখা গেল যে, খাওয়ার শুরুতে যে পরিমাণ খাদ্য ছিলো, তৎপরিমাণই আছে। আরেক বর্ণনায় আছেঃ তারা দশজন দশজন করে খেলেন। এভাবে আশিজনের খাওয়ার পর নবী (সা) ও বাড়ির লোক খাওয়া-দাওয়া সারলেন এবং অতিরিক্তগুলো রেখে চলে গেলেন। অপর বর্ণনায় আছেঃ তাদের খাওয়ার পরও এত খাবার বেঁচে গিয়েছিল যে, তা প্রতিবেশীদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হলো।

আরেক বর্ণনায় আছেঃ আনাস (রা) বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা) -এর কাছে গিয়ে দেখতে পেলাম যে, তিনি সাহাবীদের সাথে বসে আছেন এবং পট্টি দিয়ে তাঁর পেট বেঁধে রেখেছেন। আমি সাহাবীদের কাউকে জিজ্ঞেস করলাম, রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর পেট বেঁধে রেখেছেন কেন? তারা বলেন, ক্ষুধার কারণে। আমি আবু তালহার কাছে গেলাম। তিনি উম্মু সুলাইম বিনতে মিলহানের স্বামী। আমি তাঁকে বললাম, হে পিতা! আমি রাসূলুল্লাহ (সা) কে দেখলাম, তিনি পট্টি দিয়ে তাঁর পেট বেঁধে রেখেছেন। আমি কতক সাহাবীকে জিজ্ঞেস করলে তাঁরা বলেন, ক্ষুধার কারণে (তিনি পেট বেঁধে রেখেছেন)।  আবু তালহা (রা) তৎক্ষণাৎ আমার মায়ের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কিছু আছে কি? তিনি বলেন, আমার কাছে কিছু রুটির টুকরা ও কিছু খেজুর আছে। রাসূলুল্লাহ (সা) যদি আমাদের এখানে একাকী আসেন, তবে তাঁকে পেট পুরে খাইয়ে দিতে পারবো, আর যদি তাঁর সাথে আরো একজন আসে, তবে তাঁদের জন্য পরিমাণে অল্প হয়ে যাবে। অতঃপর রাবী পূর্ণ হাদীস বর্ণনা করেন।


 

Was this article helpful?

Related Articles

Leave A Comment?